ভারতীয় অর্থনীতির উপরে যুদ্ধের চাপকে আর আন্তর্জাতিক স্তরের ধাক্কা বলা মুশকিল; দেশের অর্থব্যবস্থার শিরা-ধমনীতে সে বিপদ বইতে শুরু করেছে। মার্চে পাইকারি মূল্যসূচকের নিরিখে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩.৮৮%— গত তিন বছরে সর্বোচ্চ। ভোগ্যপণ্য মূল্যসূচকের নিরিখে মূল্যস্ফীতি এখনও ৩.৪%। এখানেই বৃহত্তর দুঃসংবাদটি নিহিত— ক্রেতার গায়ে এখনও মূল্যস্ফীতির আঁচ সম্পূর্ণ লাগেনি, কিন্তু তা ইতিমধ্যেই উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে আরম্ভ করেছে। অপরিশোধিত তেলের দামে এক মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। তার অভিঘাত পেট্রোকেমিক্যাল, সার ইত্যাদির দাম ঊর্ধ্বমুখী; সরকার শেষ অবধি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হলে পরিবহণ ব্যয়েও তার প্রভাব পড়বে— এবং, সে চাপ ক্রমশ ভোগব্যয়ের খুচরো বাজারে পৌঁছবে। এই অবস্থাকে ‘স্থিতিশীল’ বলা চলে না— আবহাওয়ার পূর্বাভাসের বয়ান ধার করলে বলতে হয়, নিম্নচাপ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। পরিভাষায় একে বলা যায় ‘ল্যাগড ইনফ্লেশন’ পরিস্থিতি— যেখানে উৎপাদক স্তরের সঙ্কট এখনও উপভোক্তা স্তরে পৌঁছয়নি, কিন্তু অনিবার্য ভাবে পৌঁছবে। যুদ্ধবিরতির সাময়িক স্বস্তি এই আশঙ্কা দূর করতে পারে না; কারণ যুদ্ধের ফলে জোগান-শৃঙ্খলে যে বিঘ্ন ঘটেছে, তার অভিঘাত সরলরৈখিক নয়। ফলে, এই মুহূর্তে ভারতের অর্থনীতি এক বিলম্বিত বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের মনিটরি পলিসি কমিটি রেপো রেট অপরিবর্তিত রেখেছে। সমস্যা হল, পাইকারি মূল্যস্ফীতির চাপ খুব দ্রুত খুচরো স্তরে প্রবেশ করবে— পরিবহণ ব্যয়, সারের মূল্য, কৃষি উৎপাদনের খরচ, সম্ভাব্য এল নিনো, সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য পথগুলি ইতিমধ্যেই সক্রিয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় টাকার উপরে বিনিময় হারের চাপ এবং দেশের আমদানি-নির্ভরতা এই ঝুঁকিকে তীব্রতর করবে। ফলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের হাতেও সুদের হার না-বাড়ানোর পরিসর দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। শ্রম বাজারে ইতিমধ্যেই প্রভাব পড়েছে। মার্চে সার্বিক বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.১%— শহরাঞ্চলে ৬.৮%। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণও কমেছে। এর দায় অবশ্য সম্পূর্ণত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ঘাড়ে চাপানো মুশকিল। গত কয়েক বছরে কর্মসংস্থানের সঙ্কট বার বার সামনে এসেছে। বিশেষত শহরাঞ্চলে যুব ও মহিলাদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনক ভাবে কম। সুস্থায়ী আর্থিক বৃদ্ধির সঙ্গে যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, তবে সেই বৃদ্ধি কাঠামোগত ভাবে দুর্বল— এ কথা আরও এক বার মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি। অমৃতকালের ভারত এই কথাটি সুচারু ভাবে ভুলতে বসেছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি টালমাটাল হলে সব দেশের অর্থব্যবস্থাতেই তার প্রভাব পড়ে; কিন্তু সেই আঘাতের তীব্রতা নির্ধারিত হয় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির নিরিখে। ভারতের ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট। আর্থিক বৃদ্ধির হার ৭.৬% থেকে কমে ৬.৯% হওয়ার পূর্বাভাস, বেকারত্বের ঊর্ধ্বগতি, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার হ্রাস, এবং টাকার উপরে বিনিময় হারের চাপ— সব কিছুকে একত্রে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, ভারতীয় অর্থনীতির ভিত যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ বৃদ্ধির প্রচার করা হয়েছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধির গুণগত উপাদানগুলি— কর্মসংস্থান, আয়বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা— সে ভাবে দৃঢ় হয়নি। জ্বালানি আমদানির উপরে অতিনির্ভরতা, শিল্পনীতির অস্পষ্টতা, এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা— এই সমস্যাগুলি নতুন নয়; কিন্তু বর্তমান সঙ্কট তাদের প্রকট করেছে। এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যদি মূল্যস্ফীতি বাড়ে, বৃদ্ধি কমে, এবং কর্মসংস্থান গতি হারায়, তবে সরকার তাকে ‘যুদ্ধের অনিবার্য ফল’ বলে দায় ঝেড়ে ফেলতে পারে না। তাকে অর্থব্যবস্থার নীতিগত পরিচালনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হিসাবেই দেখা বিধেয়।