WB Elections 2026

সংসার চলবে কী করে, নাম কাটার ‘দায়’ও মেয়েদের কাঁধে

ভোটের আগে ফের উঠেছে প্রতিশ্রুতির ঝড়। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

স্বাতী ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৯

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

এক একটা বিপদ আসে, আর এক একটা নতুন শব্দ ঢোকে গ্রামের মানুষের মুখের ভাষায়। ২০১৮-তে ‘নোটবন্দি।’ ২০২০-তে ‘লকডাউন।’ আর এ বারে, এই ২০২৬-এ মুখে মুখে ঘুরছে ‘ডকুমেন্ট।’ পাথরপ্রতিমার দক্ষিণ রায়পুর। গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ছন্দা মণ্ডলকে ঘিরে বসে আছেন মেয়েরা। মেয়েরাই কেন? চার নম্বর সংসদের সদস্য রাজু গায়েন জানালেন, এখানে ১১০ জনের নাম ‘ডিলিট’ হয়েছে, তাঁদের ৭৪ জন মহিলা।এ বার অনলাইনে আপিল চলছে। মেয়েদের হাতে ব্যাগ, কোনওটায় ছাপার অক্ষরে লেখা ‘মা রেহেনা সেবাসদন,’ কোনওটায় ‘মা কালী টেলিকম।’ ভিতরে কী? উত্তর এল, ‘ডকুমেন্ট’।

শব্দটা রহস্যময়। সরকারি আবাসের নথি থেকে পোলিয়ো টিকার কার্ড পর্যন্ত সব ঢুকেছে ব্যাগে। যদি একটা-দুটোও ‘ডকুমেন্ট’ বলে জমা নেয়। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ‘ডকুমেন্ট’। টাকা খসালে স্থানীয় সাইবার কাফে বংশলতিকা বার করে দিচ্ছে। দিস্তে দিস্তে বংশলতিকায় সই করতে করতে প্রধানের রক্তচাপ বাড়ছে। এতে কী হবে? “কী জানি? ওরা বলছে, সই করে দিচ্ছি,” বললেন ছন্দা। মেশিনে শার্ট সেলাই করে, কাপড়ে জরি লাগিয়ে এই মেয়েদের সপ্তাহে রোজগার দুশো-পাঁচশো টাকা। তাঁদের হাতে তিনশো টাকার ‘ডকুমেন্ট’ দেখে বলার সাহস হয় না যে, নির্বাচন কমিশনের কাছে বংশলতিকা বৈধ প্রমাণপত্র নয়।

‘ডকুমেন্ট’ বড় বিচিত্র জিনিস। আসমা বিবি বছর দুয়েক আগে মায়ের মৃত্যুর শংসাপত্রের আবেদন করেছিলেন পঞ্চায়েতে। কর্মীর ভুলে মৃতা মায়ের নামের জায়গায় বসে গিয়েছে আসমার নাম। ব্যস, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, সব খারিজ— “কম্পিউটার আমারে মেইরে দিসে।” দু’বছর রেশন, লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ। নিজেকে ‘জীবিত’ প্রমাণ করতে আদালতে হাজার তিনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। “দু’বছর ইদে নতুন কাপড় কিনতে পারিনি,” আসমা বললেন সজল চোখে। ‘মৃত’ আসমা বিবি কিন্তু ভোটার তালিকায় জীবিত। ২০০২-এর তালিকায় নাম ছিল যে!

‘ডকুমেন্ট’ হওয়ার লড়াইয়ে নেমে মেয়েদের কাগজ কোতল হয় বেশি। কাগজের দোষ, না মেয়ে হওয়ার দোষ, কে জানে? সবরইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ, ৬৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ‘ডিলিট’ হওয়া ভোটারদের ৬০ শতাংশেরও বেশি মহিলা। ১৩১টি বিধানসভায় ৫৫-৬০ শতাংশ মহিলা। মোট ২৫৮টি বিধানসভা ক্ষেত্রে খারিজ ভোটারদের অর্ধেকেরও বেশি মহিলা। রয়েছে বৈষম্যের আরও দুটো অক্ষ — জাতপাত ও শ্রেণি। পাথরপ্রতিমার তৃণমূল বিধায়ক সমীরকুমার জানা জানান, এলাকায় ৮০০০ ভোট কাটা গিয়েছে, ৯৫ শতাংশই মুসলিম। দরিদ্র, মুসলিম, মেয়ে— তেমাথার মোড়ে যেন খাঁড়া হাতে দাঁড়িয়ে প্রশাসন।

একেই ভোটার তালিকায় মেয়েদের সংখ্যা কম। তার উপরে কেন মেয়েরা বাদ পড়ছে? প্রশাসনের জবাব, জন্মের শংসাপত্র, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, জমির দলিল— যা যা চাই, সে সব দিতে পারছে না মেয়েরা। দিলেও বিস্তর গরমিল বেরোচ্ছে। মেয়েদের প্রশ্ন, তা হলে তারা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘর, উজ্জ্বলা গ্যাস পেল কী করে? পাথরপ্রতিমার মেয়েদের কথায় আগুনের হলকা — “আমরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পাই, দিদিকে ভোট দিই, তাই আমাদের নাম কাটা গেল।” বিজেপি সমর্থক মেয়েরাও ছাড় পায়নি। বনগাঁ উত্তর আর দক্ষিণ, দু’টি বিধানসভা ক্ষেত্র (দুটোতেই বিজেপি বিধায়ক) মিলে ২৬ হাজারেরও বেশি নাম কাটা গিয়েছে, অধিকাংশই মেয়ে।

কিন্তু ক্ষোভকে বহু গুণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে ভয়। বনগাঁ দক্ষিণের ছয়ঘরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ‘কমিউনিটি সার্ভিস প্রোভাইডার’ কাজলরানি অধিকারী। ঋণ দেওয়া আর আদায়ের সূত্রে পাঁচ হাজারেরও বেশি মহিলা সদস্যের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ। কাজল বললেন, “যেখানেই মিটিং করছি, সেখানেই মেয়েরা কান্নাকাটি করছে, যদি আর ঋণ না পায়? ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়?” বাংলাদেশে ঠেলে দেবে কিনা, শিবিরে বন্দি করবে কিনা, সে পরের কথা। কাল-পরশু কী হবে? বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা বন্ধ হবে? “আমার মেয়ে বি এসসি (নার্সিং)-এর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসবে। যদি ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নাম দেখতে চায়?” বললেন সিন্দ্রানীর (বাগদা) রাখী পাল।

‘স্বচ্ছ’ ভোটার তালিকা তৈরির এমন ধুম পড়েছে যে, নাম কাটা গেলে ঠিক কী কী কাটা যাবে, তা রয়ে গিয়েছে অস্বচ্ছ। ভোগান্তি মেয়েদেরই বেশি। “বাড়ির লোক খুব বকাবকি করছে। আমার বাবার নামে ভুলের জন্য ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাবে,” ধরা গলায় বললেন বনগাঁররেখারানি সরকার। স্বামী রবিন সরকার গজগজ করলেন, “ভোটার কার্ডে শ্বশুরের নাম খোকন তরফদার, আধার কার্ডে মানিক তরফদার। এই জন্যই তো তোমার নাম কাটল।” বহু মেয়ের কথায় ক্ষোভের চাইতে আক্ষেপ বেশি। “আমার নামেই তো গ্যাস, কারেন্ট, সব কিছু। নাম কাটা যাওয়ার জন্য যদি সব বন্ধ হয়, কী হবে বাড়ির লোকের?” এসআইআর প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, অযৌক্তিকতা, যথেচ্ছাচারের দায় চাপছে সংসার-সামলানো মেয়েদের কাঁধে।

নির্বাচনী রাজনীতিতে মেয়েরা একটা শক্তি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রাজনীতির খেলা বদলে দিয়েছে এসআইআর। আগে অন্যায় বঞ্চনার প্রতিবাদে মেয়েরা নেতাদের ঘেরাও করত, ধর্নায় বসত। এসআইআর ‘ডেটা’-র অদৃশ্য দেওয়াল তুলে মেয়েদের অস্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে। মেয়েরা কার পথ আটকাবে? ডেটা-সর্বস্বতার শীতল নীতি আন্দোলনের উত্তাপে গলে না, নড়ে না। এই প্রতিপক্ষ মেয়েদের অপরিচিত।

মোথাবাড়িতে বিচারপতিদের গাড়ির উপরে হামলার ঘটনায় এক মহিলা বিচারপতির আর্ত কণ্ঠ বার বার প্রচারিত হয়েছে — “আমার কিছু হলে হাই কোর্ট যেন আমারছেলেমেয়েকে দেখে।” পাটুলির রেলবস্তির বাসিন্দা, গৃহপরিচারিকা কাকলি মণ্ডল দিদিমার কাছে মানুষ। ভোটার তালিকায় দিদিমার নাম ‘ডকুমেন্ট’ বলে গণ্য হয়নি। একক মা কাকলি এখন সবাইকে প্রশ্ন করছেন, “আমাকে যদি শিবিরে পাঠায়, কে দেখবে ছেলেমেয়েকে?” আদালত, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্র, রাজ্য — কারও কাছে এর উত্তর নেই। রাজনীতির শিবিরগুলো মত্ত রয়েছে অন্য প্রশ্নে। কাটা-পড়া ভোটার এর ভোট কাটবে, না কি ওর?

রাজনীতিতে হিংসার জন্য ভারী বদনাম পশ্চিমবঙ্গের। রক্তপাত না হয়ে এখানে নির্বাচন হয় না। এ বার রাজ্য দেখছে এক রক্তপাতহীন হিংসা — শুধু ‘ডকুমেন্ট’ দিয়ে লোককে ‘নেই’ করে দেওয়া। আর সব হিংসারমতো, এ খেলাতেও মেয়েরাই মারা পড়ছে বেশি।

আরও পড়ুন