উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র রিপোর্টে প্রকাশ, ২০২২ সালে ভারতে আত্মহত্যার সংখ্যা নথিভুক্ত হয়েছে ১,৭০,৯২৪। এর মধ্যে ১৩,০৪৪ জনই শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, দৈনিক প্রায় ৩৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথটি বেছে নিয়েছে। অথচ, এমন মর্মান্তিক বিষয় নিয়ে সার্বিক সচেতনতা এবং উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্যেও সেই উদ্বেগই ফুটে উঠেছে। বছর দুয়েক পূর্বে বিশাখাপত্তনমের হস্টেলে পশ্চিমবঙ্গের এক ছাত্রীর অপমৃত্যুর ঘটনা সংক্রান্ত রায় জানাতে গিয়ে শীর্ষ আদালত দেশে পড়ুয়াদের আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, কোচিং সেন্টারের প্রতি ১৫টি নির্দেশিকা জারি করেছে। বলা হয়েছে— ২০২৩ সালে স্কুলপড়ুয়াদের আত্মহত্যা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক দ্বারা প্রকাশিত ‘উম্মিদ’ নামক খসড়াবিধি, কোভিড এবং তৎপরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা দানে কেন্দ্রীয় উদ্যোগ ‘মনোদর্পণ’ এবং জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ নীতির সূত্র ধরে একটি অভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যবিধি গ্রহণ করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে।
অধিকাংশ নির্দেশই অবশ্য যে কোনও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামোয় প্রত্যাশিত। যেমন— শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত এক জন কাউন্সেলর, মনোবিদ অথবা শিশু ও বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমাজকর্মী নিয়োগ করা; শিক্ষাগত সাফল্যের নিরিখে পড়ুয়াদের ব্যাচ ভাগ না-করা; আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংক্রান্ত হেল্পলাইন নম্বর ছাত্রাবাস, শ্রেণিকক্ষ, কমন এরিয়া এবং ওয়েবসাইটে মজুত রাখা; বছরে অন্তত দু’বার পেশাদার মনোবিদের কাছে সমস্ত শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি। অথচ, কতগুলি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই পথে হাঁটে? চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এযাবৎ আইআইটি খড়্গপুরের চার জন শিক্ষার্থী হস্টেলের ঘরে আত্মহত্যা করেছে। সেই প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালতও। অতঃপর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তাঁরা অবিলম্বে পূর্ণ সময়ের মনোবিদ নিয়োগ করতে চলেছেন।
প্রশ্ন হল, দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শীর্ষ আদালতের প্রতিক্রিয়া অবধি অপেক্ষা করতে হয় কেন? নির্দেশিকায় উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়ই আগে আলোচিত। আগেই কর্তৃপক্ষ তা পালনে সম্মত হয়েছেন, শিক্ষা দফতর সম্মতি দিয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। নিগৃহীত, মানসিক যন্ত্রণায় কাতর শিক্ষার্থী দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের কাছে গিয়ে সাহায্য পায়নি, ক্যাম্পাস রাজনীতি তার ক্ষতকে আরও খুঁচিয়ে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবটি আসলে বড় অন্তরায়। আইআইটি খড়্গপুরের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, ‘ইন্ডাকশন প্রোগ্রাম’-এ অভিভাবকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা। ভাবনাটি ভাল, কারণ ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই ভাল ফলের জন্য ‘বাড়ির অত্যধিক’ চাপের কথা জানিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব এড়াতে পারে না। শিক্ষার্থীরা প্রাপ্তবয়স্ক, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচিত, তাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটিকে পোক্ত করা, প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য-সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। সমস্ত অভিভাবককে ডেকে শিক্ষাদান খুব সুফলদায়ক না-ই হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি নিজের কাজটুকু সুষ্ঠু ভাবে করলেই অনেকখানি ফল মেলার কথা।