ছবি : ইউটিউব।
জনপরিসরে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগের কুঅভ্যাস ভারতের কলঙ্ক। অশোভন তো বটেই, নারী ও শিশুর পক্ষে এমন ঘটনার সম্মুখীন হওয়া অস্বস্তিকর, অপমানজনক এবং বহু ক্ষেত্রেই জনপরিসরে অসুরক্ষিত হয়ে পড়ার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এই উপদ্রব রোধে ভারতীয় শহরগুলি নানা পথ নিয়েছে। কোথাও দেওয়ালে দেবদেবীর ছবি আঁকা হয়েছে, জরিমানার কথা লেখা থেকেছে, ‘শেম স্কোয়াড’ এসে বাঁশি বাজিয়েছে, কোথাও খোদ মহানাগরিক বেত্রাঘাত পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু, সমস্যার সমাধান মেলেনি। এই প্রেক্ষিতে মাইসুরু সিটি কর্পোরেশন এক অভিনব পদক্ষেপ করল। কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডের কাছে প্রায় ৮০ মিটার দীর্ঘ ফাঁকা দেওয়ালে চকচকে স্টেনলেস স্টিলের প্রতিফলক লাগানো হয়েছে, যা আয়না সদৃশ ও টেকসই। এই প্রতিফলকের সামনে দাঁড়ানো মানুষকে পথচারীরাও পরিষ্কার দেখতে পাবেন। রাতেও যাতে প্যানেলগুলি দেখা যায় তার জন্য স্বয়ংক্রিয় আলো রয়েছে। আচরণবাদী অর্থশাস্ত্রে একে ‘নাজ’ বলা হয়— প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগের অপকর্মটি যারা করছে, তারা নিজেদের সেই কীর্তিটি দেখতে পাবে; জানবে যে, অন্যরাও তাদের দেখছেন। সেই লজ্জায় কাজ হচ্ছে— অপকর্মের সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
প্রশ্ন হল, যে দেওয়ালে আয়না নেই, তাকে রক্ষা করবে কে? আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখে যারা কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডের সামনের দেওয়ালটিকে রেহাই দেবে, তারাই যে পার্শ্ববর্তী কোনও অন্ধকার গলি অথবা দেওয়ালকে বেছে নেবে না, ‘নাজ’ তত্ত্ব তার নিশ্চয়তা দেয় না। অর্থাৎ, এই আয়না-দেওয়ালের গুণাগুণ সেই বাহ্যিক পরিসরটিতেই সীমাবদ্ধ— মানুষের স্বভাবকে পাকাপাকি ভাবে পাল্টানোর সাধ্য তার নেই। তাতে এই পদ্ধতির গুরুত্ব হ্রাস পায় না, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতার কথাটি মাথায় রাখলে বৃহত্তর নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়।
অতএব, আয়না সম্পূর্ণ সমাধান নয়, প্রয়োজন নগর পরিকাঠামোর উন্নয়ন। নির্দিষ্ট ব্যবধানে পর্যাপ্ত, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সুলভ গণশৌচালয় থাকলে তবেই এই প্রবণতায় লাগাম দেওয়া যেতে পারে। ভারতীয় গ্রামে-শহরে স্বাস্থ্যকর শৌচাগারের অভাব একটি জ্বলন্ত সমস্যা। তবে, অস্বীকার করা যায় না যে, চোখের সামনে শৌচাগার থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ রাস্তাকেই ব্যক্তিগত শৌচালয় ভেবে নেন। জনপরিসরে নাগরিক দায়িত্ব ও আচরণ সম্পর্কিত বোধের এখানে বড়ই অভাব, ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ বা অনুরূপ কোনও প্রকল্পই তাকে সংস্কৃতি রূপে গড়ে তুলতে পারেনি, এখনও। রাস্তা নোংরা করা, প্রকাশ্যে অভব্যতা, জনস্বাস্থ্যকে অবহেলায় প্রকৃতপক্ষে সামাজিক শিক্ষার অভাবও প্রকট। অতএব, মূল সমস্যাটি দ্বিস্তরীয়। প্রথমত, পরিকাঠামোর ঘাটতি, দ্বিতীয়ত, নাগরিক আচরণের সঙ্কট। অতএব, বিষয়টি নিয়ে গভীরে ভাবনা প্রয়োজন এবং মাইসুরু ঠিক পথেই চলেছে। কিন্তু, প্রশ্ন ওঠে, এই প্রকল্পে সাড়ে নয় লক্ষ টাকা খরচের বদলে সেই অর্থে পর্যাপ্ত শৌচালয় স্থাপন ও তা রক্ষণাবেক্ষণই কি সঙ্গত হত না? প্রযুক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা তো নাগরিক পরিষেবার স্বয়ংসম্পূর্ণ বিকল্প নয়। এই প্রতিফলক মানুষের ব্যর্থতার পাশাপাশিই পুর পরিষেবার এক বনিয়াদি ঘাটতিকেও আয়নার সম্মুখে দাঁড় করায়।