JNU

চক্রবৎ

বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই চিন্তা-চেতনার অবাধ বহিঃপ্রকাশের জায়গা, সেখানে রাজনৈতিক মতের পাশে অমত তথা বিরোধিতারও প্রকাশ ঘটবে, এমনকি বয়সোচিত উত্তেজনায় তরুণ ছাত্রদের মুখে তার প্রকাশ সব সময় খুব সুখশ্রাব্য বা মার্জিত হবে না— এটুকু বুঝতে পারা কঠিন নয়।

শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৮

বছরের প্রথম সপ্তাহে জেএনইউ-এর ছাত্রদের বিক্ষোভ জমায়েত থেকে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশে অভিযোগ করেছেন, কয়েকজন পড়ুয়ার নাম উল্লেখ করে বলেছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার কথা। ওই একই দিনে জেএনইউ-এর দুই প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন সুপ্রিম কোর্টে নাকচ হয়; তদুপরি ২০২০-তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবরমতী হস্টেলে ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনার ষষ্ঠ বর্ষপূর্তিও পালন করছিল বাম ছাত্র সংগঠনগুলি— সেই ধর্না-অবস্থানের আবহেই মোদী-শাহ বিরোধী স্লোগানের উৎপত্তি। স্বভাবতই এ ঘটনার পর এবিভিপি ও বিজেপি নেতাদের মুখেও ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ শব্দবন্ধ ফিরে এসেছে, যে পথে উমর খালিদদের জেলে পোরা গিয়েছে সে পথেই এই ছাত্রদেরও উচিত শিক্ষা দেওয়ার কথা হাওয়ায় ঘুরছে।

উমর খালিদরা অবশ্য অন্য ঘটনায় অভিযুক্ত। জেএনইউ-এর সাম্প্রতিক ঘটনা বরং মনে পড়ায় ঠিক দশ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নেতা কানহাইয়া কুমারের গ্রেফতারি— যার কারণ ছিল একই রকম: বিতর্কিত স্লোগান তোলা। পরে প্রমাণাভাবে ছাড়া পেলেও, এই ঘটনায় তখন কম জল ঘোলা হয়নি। তবে ২০১৬-র আর আজকের বিজেপির মধ্যে বিস্তর তফাত, সে দিন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতে রাজনৈতিক ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের যে ‘প্রকল্প’ সবে শুরু হয়েছিল বলা চলে, আজ তা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজেপির প্রত্যাশিত পরিণতি পেয়েছে— রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে শুরু করে জনমানসে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়াতেও। গত দশ বছরে ইউএপিএ-র মতো আইনের ব্যাপক প্রয়োগের নানা উদাহরণ এবং এই আইনে অভিযুক্তদের বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও জামিনের প্রায়-অনুপস্থিতিই প্রমাণ, শাসকের বিরুদ্ধে গলা চড়ালে নাগরিকের বিপদ এখন সমূহ ও সুদূরপ্রসারী।

এই পরিপ্রেক্ষিতে জেএনইউ-এর সাম্প্রতিক ঘটনাটিতে উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়ার ‘অপরাধ’-এ ছাত্রদের উপর শাসকের প্রত্যাঘাতের আশঙ্কা অমূলক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই চিন্তা-চেতনার অবাধ বহিঃপ্রকাশের জায়গা, সেখানে রাজনৈতিক মতের পাশে অমত তথা বিরোধিতারও প্রকাশ ঘটবে, এমনকি বয়সোচিত উত্তেজনায় তরুণ ছাত্রদের মুখে তার প্রকাশ সব সময় খুব সুখশ্রাব্য বা মার্জিত হবে না— এটুকু বুঝতে পারা কঠিন নয়। ছাত্রছাত্রীদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা শিক্ষকেরা ঘেরাও হয়ে আছেন, কিংবা ক্যাম্পাসে আসা সম্মাননীয় অতিথির চোখের সামনে কালো পতাকা তুলে ধরে ছাত্রকুল সমস্বরে স্লোগান দিচ্ছে, এমন ঘটনা সুখকর না হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রচলসিদ্ধ; কর্তৃপক্ষ বা অতিথি তার জেরে থানা-পুলিশ করেন না— বা বলা ভাল এতকাল করতেন না। দেশের প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামে ছাত্রেরা স্লোগান দিচ্ছে বলেই যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তা ‘উস্কানিমূলক’ মনে হয়, যদি পুলিশের কাছে নামের লিস্ট ধরিয়ে ব্যবস্থা করতে বলা হয়, তবে বুঝতে অসুবিধে হয় না: বিরুদ্ধস্বর ও ভিন্নমতের প্রতি বিদ্বেষ কোন স্তরে পৌঁছেছে, তাদের উপস্থিতি পর্যন্ত সহ্য করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের হাতে জামিনহীন, বিচারহীন দীর্ঘ ক্লান্তিকর শাস্তির কথা না-হয় তোলাই থাক।

আরও পড়ুন