পড়শি রাষ্ট্র মায়ানমারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। তিন পর্বের প্রথম পর্ব গত ২৮ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হয়েছে। বাকি দুই পর্ব চলবে জানুয়ারি মাস জুড়ে। কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সেনাবাহিনী (জুন্টা) জনপ্রিয় নেত্রী আউং সান সু চি-র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)-র ২০২০ সালের জয়কে বাতিল করার প্রায় পাঁচ বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই অভ্যুত্থানই ব্যাপক বিক্ষোভ, সেনাবাহিনীর সহিংস দমনপীড়ন এবং জাতিগত সংখ্যালঘু মিলিশিয়ার সঙ্গে জোটবদ্ধ সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের জন্ম দিয়েছে।
এই পটভূমিতে, শুধুমাত্র জুন্টা নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলিতেই এখন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কাগজে-কলমে, ৫৭টি রাজনৈতিক দল এবং ৪,৮০০ জনেরও বেশি প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও, বাস্তবে চিত্রটি উল্টো। সেনাবাহিনী প্রণীত নিয়মের অধীনে মাত্র ছয়টি দলকে দেশব্যাপী প্রতিযোগিতা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সু চি এখনও সামরিক বন্দিদশায়, তাঁর দলকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখান বৃহত্তম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী হল সামরিক-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি), যারা বহু নির্বাচনী এলাকায় কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে। নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হলেও, মায়ানমারের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন ভাবেই তৈরি যাতে সামরিক আধিপত্য বজায় থাকে। ২০০৮ সালের সংবিধান অনুসারে, সংসদীয় আসনের ২৫ শতাংশ কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত, যা সামরিক বাহিনীকে সাংবিধানিক পরিবর্তনের উপর কার্যকর ভেটো ক্ষমতা প্রদান করে। মায়ানমারের সামরিক শাসকরা নির্বাচন পরিচালনা করছেন তাঁদের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই। অধিকাংশ পশ্চিমি রাষ্ট্র গোটা প্রক্রিয়াটিকে প্রহসন বলে মনে করছে। ভারত ও চিন অবশ্য মায়ানমারের নির্বাচনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে।
ভুললে চলবে না, মায়ানমারের গৃহযুদ্ধের আঁচ পড়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও। এই পরিস্থিতি সাম্প্রতিক কালে উল্লেখযোগ্য ভাবে উস্কে দিয়েছে মণিপুরের মেইতেই-কুকি জাতিগত উত্তেজনাকে, যার ফলে শরণার্থী প্রবাহ ও মাদক পাচার বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষমতা বেড়েছে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির। সীমান্ত এলাকাগুলির এ-হেন অস্থিতিশীলতা স্বাভাবিক ভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে। যে কোনও হিংসাই এই অঞ্চলে পুনরায় পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে, ফলে ভারতকে পা ফেলতে হচ্ছে সাবধানে। এ দিকে, দুই দেশের বেশ কয়েকটি সংযোগ প্রকল্প রয়েছে। যেমন, ভারত-মায়ানমার-তাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক, যা মণিপুরের মোরে-কে মায়ানমারের মধ্য দিয়ে তাইল্যান্ডের মে সোতের সঙ্গে সংযুক্ত করে। শুধু তা-ই নয়, কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজ়িট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পেও বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে ভারত। শিলিগুড়ি করিডরের পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরও উন্নত সংযোগ ব্যবস্থার জন্য চিনের প্রভাব বলয়ের বাইরে ভারতের এক স্থিতিশীল, সার্বভৌম প্রতিবেশীর প্রয়োজন, যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অস্থিরতার মাঝে, বাকি পড়শি রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক এখন আরও বেশি জরুরি দিল্লির কাছে।