Indian Farmers

সত্যেরে লও সহজে

এই অকারণ বিভ্রান্তির অবসান হউক। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৬:৩৯
ফাইল চিত্র।

ফাইল চিত্র।

বা‌ংলার চাষির রোজগার কত, জানাইয়াছে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার সাম্প্রতিক রিপোর্ট। পশ্চিমবঙ্গে কৃষকের গড় মাসিক আয় ছয় হাজার সাতশো টাকা, যাহা অধিকাংশ রাজ্যে কৃষকের গড় আয়ের চাহিতে কম। ইহাই প্রত্যাশিত চিত্র, বিবিধ সর্বভারতীয় সমীক্ষায় যাহা প্রকট হইয়াছে। স্বল্প জমি, সামান্য বিনিয়োগ এবং দুর্বল বিপণনব্যবস্থা বাংলার চাষিকে পিছাইয়া রাখিয়াছে। তৎসত্ত্বেও চাষির রোজগার লইয়া বিভ্রান্তি দেখা দিয়াছিল ২০১৮ সালে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক বিচিত্র হিসাব পেশ করিয়াছিল, যাহাতে বাংলার চাষির রোজগার পঞ্জাবের চাষিকেও ছাড়াইয়াছিল। সাত-আট বৎসরে চাষির রোজগার তিনগুণ হইয়াছে, এই দাবি শোরগোল ফেলিয়াছিল। বস্তুত এই হিসাবের গোড়ায় গলদ ছিল— গণনায় মূল্যবৃদ্ধি বাদ পড়িয়াছিল বলিয়াই চাষির রোজগার লম্ফ দিয়া দেশের শীর্ষে উঠিয়াছিল। তবু চাপান-উতোর সহজে থামে নাই, কারণ, নির্বাচনের মুখে কেন্দ্র ও রাজ্য পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্র করিয়াছিল। এই যুদ্ধে বাংলার চাষির ভূমিকা উৎপাটিত উলুখাগড়ার ন্যায়। দেশের সর্বাপেক্ষা ধনী চাষিকে আরও সমৃদ্ধ করিবার নীতি যাহা হইবে, দেশের সর্বাপেক্ষা দরিদ্র চাষির সহায়তার নীতি তাহা হইতে পারে না। বাংলার চাষি ইহার মধ্যে কোনটি? রাজ্যের দাবি অনুসারে তাঁহার আয় মাসে কুড়ি হাজার টাকা ধরিলে, তাঁহাকে বার্ষিক ষোলো হাজার টাকা অনুদান দিবার প্রয়োজন কী? কেনই বা রাজকোষের অর্থে তাঁহাকে সহায়ক মূল্য দিতে হইবে? রাজ্য সরকার স্বয়ং চাষির সমৃদ্ধির দাবি করিয়াও চাষির সহায়তা বাড়াইয়াছে। বিরোধীরাও তাহাতে আশ্চর্য কিছু দেখেন নাই।

এই অকারণ বিভ্রান্তির অবসান হউক। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। বাংলার চাষির রোজগার কম, এই সত্যকে গ্রহণ করিতে হইবে। ভাবিতে হইবে রোজগার বাড়াইবার উপায়। পঞ্জাবের চাষিকে রোজগারে টেক্কা দিবার লক্ষ্যেই কি বাংলার চাষি দিনাতিপাত করিতেছেন? অলীক স্বপ্ন দেখাইবার প্রয়োজন নাই, আপাতত চাষির বিনিয়োগ ও শ্রমের ন্যায্য মূল্য মিলিবার উপায় বাহির করিলেই অনেক উপকার হইবে। তাহার জন্য প্রয়োজন ন্যায্য দামে উন্নত মানের উপাদান সংগ্রহ, সেচের বিস্তার, নিকাশির উন্নতি, ফসল সংরক্ষণের বিস্তার, এবং বিপণনের স্বচ্ছ ও অবাধ ব্যবস্থা। এইগুলি অতি মৌলিক প্রয়োজন, কিন্তু আজও পূরণ হয় নাই। রাজ্যের অর্ধেক চাষি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় আসেন নাই, এবং মাথাপিছু ঋণের পরিমাণও অত্যন্ত কম। এত অল্প বিনিয়োগে কৃষি হইতে সমৃদ্ধি সম্ভব নহে। বাংলার কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনও চাষি পরিবারের আপন প্রয়োজন মিটাইতেছে। ফসল বাজারজাত করিবার পর্যায়ে বহু চাষি আসেন নাই।

Advertisement

এমন নহে যে, গত এক দশকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-শাসিত রাজ্যে চাষের বিশেষ কোনও উন্নতিই হয় নাই। দশ বৎসরে ফসলের বৈচিত্র বাড়িয়াছে, উচ্চমূল্যের ফসলের চাষে আগ্রহী হইয়াছেন চাষিরা। সংরক্ষণের পরিকাঠামো উন্নত হইয়াছে, কৃষক-উৎপাদক কোম্পানি বিপণনকে লাভজনক করিবার পথ দেখাইয়াছে। কিন্তু মৌলিক সঙ্কটগুলি যায় নাই— সেচ, নিকাশি, কৃষিঋণ, ফসল বিমার পরিকাঠামো সীমিত ও দুর্বলই থাকিয়া গিয়াছে। তৎসহ চাষের অনিশ্চয়তা বাড়াইয়াছে জলবায়ু পরিবর্তন। এই পরিস্থিতিতে কেবল কৃষি অনুদান বাড়াইয়া, অথবা দুর্যোগের পরে ক্ষতিপূরণ বিলাইয়া চাষির রোজগার বাড়িবে না। চাষের সুস্থায়ী উন্নয়নের জন্য ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের নীতি হইতে কৃষি-সমস্যার জন্য নিবেদিত আদালত, সকলই প্রস্তুত করিতে হইবে। কেবলই রাজনীতির দান দিয়া এই সকল হইবার নহে। রাজ্য সরকার প্রশাসকের কর্তব্যে ফিরিবে কবে?

Advertisement
আরও পড়ুন