নির্বাচন-পরবর্তী হিংসায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুনঃপ্রকাশিত শহর তথা রাজ্যের এক ভয়াবহ আইনবিরোধী স্পর্ধা। তদন্তকারীরা যে গাড়ি ও মোটরবাইকের হদিস পেয়েছেন, সেগুলিতে একাধিক বার নম্বর প্লেট বদলানো হয়েছে এবং বাইকের হস্তছাপ-স্বরূপ ভিআইএন পর্যন্ত বিকৃত করার অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ, পরিচয় গোপন করা উদ্দেশ্য তো বটেই, অপরাধীরা জানত এই ছলে তারা পুলিশের চোখে ধুলো দিতে পারবে। এই ঘটনা জ্বলন্ত উদাহরণ যে, কী ভাবে ভুয়ো নম্বর প্লেটের চক্র সংগঠিত অপরাধের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এক বেলাতেই অতি সহজে হুবহু নকল নম্বর প্লেট তৈরি করা যায় এখানে। বহু লোকই পদ্ধতিগত ঝক্কি ও সময়ের দোহাই দিয়ে বা অপরাধের উদ্দেশ্যে নানা ভাবে আইন এড়াতে চেষ্টা করতে পারে। সেই প্রবণতাকে রুখে দেওয়াই প্রশাসনের কাজ। কিন্তু এখানে দিনেদুপুরে যে ভাবে পুলিশের ধরাছোঁয়ার মধ্যেই প্লেট বদলের ব্যবসা চলে, তা প্রশাসনিক শৈথিল্যকেই উন্মোচিত করে।
সড়কসংক্রান্ত বহু অমীমাংসিত মামলার মূলেই ভুয়ো নম্বর প্লেট। এর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সড়ক ও বাইক দুর্ঘটনার মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে ঠিকই, তবে দুর্ঘটনা ঘটুক বা না ঘটুক, এই পথ যে অন্যায়-অপরাধের, সেই নৈতিক বোধটা প্রশাসন ও সাধারণ্যে জাগ্রত থাকা জরুরি। একটি নম্বর প্লেট তো একটি গাড়ির পরিচয়পত্র, তা মানুষের ক্ষেত্রে আধার কার্ড বা পাসপোর্টের শামিল। সেগুলি জাল করলে যে ভাবে সমস্যার পাহাড় গড়ে ওঠে, এ ক্ষেত্রেও তা-ই। দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে দুর্ঘটনা ছাড়াও হত্যা, অপহরণের যোগসাজশ থাকে। আলোচ্য হত্যাকাণ্ড সূত্রেই প্রমাণিত, ভিনরাজ্যের দুষ্কৃতীরা কী ভাবে এই গাফিলতির সুযোগে অবাধে যাতায়াত করছে। মানুষ মেরে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় এই কৌশল তো প্রায়শই সাফল্যের সঙ্গে প্রযুক্ত। নজরদার ক্যামেরায় ধরা নম্বর যদি অন্য মানুষের নামে নথিভুক্ত হয় তবে তদন্ত বিপথে চলে, অপরাধী বেপাত্তা হয়। ভুয়ো নম্বর ব্যবহারকারী ই-চালান, নজরদার ক্যামেরা, পুলিশের ভয় থেকে মুক্ত থাকে। ফলে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, সিগন্যাল ভাঙা, উল্টো পথে গাড়িচালনার প্রবণতা বাড়ে। শহর দুর্বৃত্তের মুক্তাঞ্চল হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন নিয়মিত অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর ও কঠোর নিশ্ছিদ্র আইনের শাসন। নম্বর প্লেটপ্রস্তুতকারী সমস্ত দোকান, কারখানায় লাইসেন্সের কড়াকড়ি রাখতে হবে। রেজিস্ট্রেশন প্লেটকে অনুমোদিত ও উচ্চ নজরদারিসম্পন্ন ব্যবস্থার আওতায় আনতেই হবে, যাতে কারুকাজসম্পন্ন বা অস্পষ্ট নম্বর প্লেটকে কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা না হয় এবং নথি যাচাই ছাড়া নম্বর প্লেট তৈরি করলে তৎক্ষণাৎ লাইসেন্স বাতিল করা যায় ও ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৬৫ ধারায় জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্ত করা যায়। উচ্চ নজরদারিসম্পন্ন প্লেট ছাড়া রাস্তায় গাড়ি দেখলেই বিক্রেতার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা বিধেয়। হায়দরাবাদ, কোঝিকোড় প্রভৃতি শহর ‘ক্লোন নম্বর প্লেট’ শনাক্তকরণে কৃত্রিম মেধা ব্যবহার করে ভাল ফল পেয়েছে। এ নিছক ট্র্যাফিক আইনভঙ্গের প্রশ্ন নয়, জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাও এর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।