লোহার গেট ধরে অঝোর কাঁদছিল মেয়েটি। অন্যত্র এক মা নিরাপত্তাকর্মীর হাতে-পায়ে ধরছিলেন, যেন এক বার পরীক্ষাকেন্দ্রের গেট খুলে দেওয়া হয়। এ সবই ২১ জুনের ছবি, নিট-ইউজি’র পুনঃপরীক্ষার দিন। পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) নির্বিঘ্নে পরীক্ষা শেষ হওয়ার রীতিমাফিক দাবি করেছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা অন্য রকম। দেড়টায় গেট বন্ধ হওয়ার পরে যাঁরা পরীক্ষাকেন্দ্রে এসে পৌঁছেছিলেন, তাঁদের অনেককেই ফিরে যেতে হয়েছে। নিট-এর মতো সর্বভারতীয় একটি প্রবেশিকা পরীক্ষা, যেখানে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর পরিবারেরও এক দীর্ঘ মানসিক, আর্থিক প্রস্তুতি জড়িয়ে থাকে, সেখানে এ-ভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরিণতি মর্মান্তিক হতে পারে। তদুপরি, এটি ‘পুনঃপরীক্ষা’। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ৩ মে-র পরীক্ষাটি ন’দিনের মাথায় বাতিল হয়। অতঃপর দীর্ঘ দেড় মাসের অপেক্ষা। তার পরেও কেন এমন অ-মানবিক মুখ? শিক্ষার্থীদের এক বিরাট অংশের উচ্চশিক্ষা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্নটি যেখানে জড়িয়ে, সেখানে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই সুপ্রশাসনের কাজ। দুর্ভাগ্য, এ দেশে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেদের দোষ ঢাকতে যত তৎপর, আগামী প্রজন্মের পাশে দাঁড়াতে তার ছিটেফোঁটাও নয়। সে উদাহরণ শুধু নিট-ইউজি’র ক্ষেত্রে নয়, বহু সর্বভারতীয় পরীক্ষা, এমনকি সিবিএসই দ্বাদশের ফলপ্রকাশেও দেখা গিয়েছে।
মেডিক্যাল স্নাতকে ভর্তির এই সর্বভারতীয় পরীক্ষায় বসেছিলেন প্রায় ২২ লক্ষ ৭৯ হাজার পরীক্ষার্থী। দেশের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কেন্দ্রে এই প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। সুতরাং, এ-হেন পরীক্ষার গুরুত্ব অনুমান করা কঠিন নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল এক মসৃণ পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষার্থীদের হয়রানিকে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ভারতের মতো জনবহুল দেশে যানজট, রাজনৈতিক সমাবেশে আটকে,পথ-দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পরীক্ষাকেন্দ্রে বা কর্মক্ষেত্রে সময়ে পৌঁছতে না-পারা দৈনন্দিনতায় পর্যবসিত। সে কথা মাথায় রেখেই এই পরীক্ষার্থীদের অন্তত পরীক্ষায় বসতে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাঁরা যে সকলেই ফের সামনের বছর পরীক্ষায় বসতে পারবেন, তা নিশ্চিত করে বলা চলে না। তাঁদের স্বপ্নকে অতএব টুঁটি টিপে মারার ব্যবস্থা করা হল। আবার, প্রয়াগরাজে পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তিত হয় একেবারে শেষ মুহূর্তে। শেষ মুহূর্তের এমন পরিবর্তন, নতুন অ্যাডমিট কার্ড দেওয়া পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে, বিভ্রান্তিরও জন্ম দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই হয়রানির বিষয়গুলি এখনও অবিবেচিতই থাকছে।
আশ্চর্য হল, যে পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা গেট বন্ধের সময় নিয়ে এমন কঠোর হতে পারে, সেই তারাই আবার একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত। সে ক্ষেত্রে আয়োজকদের ক্ষেত্রেও ভুল-ত্রুটি অমার্জনীয় হওয়া জরুরি। পরীক্ষার্থী নিয়ম না মানলে তাঁদের জন্য বরাদ্দ কঠোরতম শাস্তি, অথচ প্রশ্ন ফাঁসের মতো বিপুল কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজ পদে বহাল থাকবেন এবং ভবিষ্যতে কঠোরতর নিরাপত্তার ফাঁপা আশ্বাস শোনাবেন— এই দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া আবশ্যক।