আগামী কাল, ৪ জুলাই, সার্ধদ্বিশতবার্ষিকী পূর্ণ হবে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার। ১৭৭৬ সালের এই দিনেই গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ। টমাস জেফারসনের মূল খসড়ায় এবং কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস কর্তৃক গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটিতে বলা হয়েছিল, আমেরিকার উপনিবেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবশেষে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করবে। বস্তুত, ঘোষণাটি শুধু দেশটির রাজনৈতিক পরিচিতি নতুন করে গড়ে তোলেনি, বিশ্ব জুড়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলিকেও প্রভাবিত করেছিল। যে কোনও বার্ষিকী কেবল কোনও সাফল্যের উদ্যাপনই নয়, বরং এটি পথচলার রোমন্থন এবং ভবিষ্যতের দিগ্নির্দেশনা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক সুবর্ণ সুযোগও। সেই সূত্রেই এই ঐতিহাসিক ঘটনা সংক্রান্ত বিবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দাবি, উদ্যাপনের উদ্দেশ্য কেবল দেশটির প্রতিষ্ঠার কথা স্মরণ করা নয়, বরং এর ইতিহাস পর্যালোচনা করা এবং আগামী ২৫০ বছরের দিকেও দৃষ্টিপাত করা।
লক্ষণীয়, আমেরিকার স্বাধীনতার সেই যুগান্তকারী ঘটনার পর থেকেই অধিকার ও নাগরিকত্বের ধারণা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং শীঘ্রই তা সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান আদর্শে পরিণত হয়। রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির ফলে প্রজার উপর অর্পিত কর্তব্যের ধারণার পরিবর্তে নাগরিকের অধিকারের ধারণার প্রচলন হয়। এ ভাবেই, আমেরিকা প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে এবং প্রজা থেকে নাগরিককে আইনত ভাবে সংরক্ষিত ও বলবৎযোগ্য ব্যক্তিগত অধিকার প্রদান করে ইতিহাসের প্রথম সাংবিধানিক গণতন্ত্র হয়ে ওঠে। অথচ, কাকতালীয় ভাবে, সেই দেশেরই স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী এমন এক সময়ে উদ্যাপিত হতে যাচ্ছে, যখন গণতন্ত্রের পশ্চাদ্পসরণ ঘটেছে— যার নেপথ্যে রয়েছে নব্য-সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিগত ও বর্ণবাদী রাজনীতির এক বিষাক্ত ও উদ্বেগজনক উত্থান। ফলে, আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের মাঝে আত্ম-পর্যালোচনার দাবি ওঠা অস্বাভাবিক নয়— বিশেষত ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পদটিকে একপ্রকার একচ্ছত্র ক্ষমতার আধিপত্যে পরিণত করার প্রেক্ষাপটে। আজ, রাজনৈতিক দলগুলির কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং মেরুকরণের তীব্র বৃদ্ধি— কেবল আমেরিকাতেই নয়, ভারত-সহ বিশ্বের অন্যত্রও— আইনসভার কর্তৃত্ব এবং নির্বাহী বিভাগকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
১৭৮৭ সালে আমেরিকার সংবিধান প্রণয়নের পর যখন সেই সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে এক নাগরিক প্রশ্ন করেছিলেন, মানুষ কী পেল— প্রজাতন্ত্র না রাজতন্ত্র, তখন তাঁর উত্তর ছিল, ‘প্রজাতন্ত্র— যদি আপনারা তা ধরে রাখতে পারেন।’ আজ উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থা তীব্র চাপের মুখে। এ-হেন পরিস্থিতিতে এগুলিকে রক্ষা করতে নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া জরুরি। সেই গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি, যা জয় ও বিপর্যয় উভয় পরিস্থিতিতেই এই প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের নৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ রেখে যাওয়া হচ্ছে, সেটাই হল আড়াইশো বছরের দেশের চ্যালেঞ্জ; প্রতিশ্রুতিও।