Society

ভয়ঙ্কর

জাতি বর্ণ ধর্ম-পরিচয় বা পোশাক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনচর্যায় ‘ভিন্ন’ এক বা অনেক নাগরিকের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হচ্ছে আরও অনেক মানুষ।

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ০৭:৪৬

ভাষা সমস্যার জেরে মানুষে মানুষে যোগাযোগে বিভ্রাট বা ভুল বোঝাবুঝি পর্যন্ত মেনে নেওয়া চলে। কিন্তু ভাষা না বোঝার সমস্যায় এক জন নাগরিকের প্রাণ চলে যাবে— এই ভাবনাও ভয়ঙ্কর। পশ্চিমবঙ্গ সেই উদাহরণই বাস্তবে তুলে ধরল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলিতে গত সপ্তাহে গণপিটুনিতে কেরলের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায়। বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে ঘুরতে এসে স্থানীয় বাজারে বেরিয়ে পথ ভুলে অন্য পাড়ায় ঢুকে পড়েন ওই যুবক, ভাষা না জানায় স্থানীয় মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তার পরেই দড়িতে বেঁধে প্রচণ্ড মারধর করা হয় তাঁকে, গণপ্রহারে মৃত্যু হয়। মারধরের ভাইরাল ভিডিয়ো দেখে পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রুজু, অভিযুক্ত কয়েকজনকে গ্রেফতার— সবই ঘটেছে, কিন্তু নাগরিকের অমূল্য প্রাণ চলে যাওয়ার পরে।

গণপিটুনির পিছনে উন্মত্ত বিভ্রান্ত জনতার যে মনস্তত্ত্ব কাজ করে, তার প্রতিটি উপকরণই এই ঘটনায় মজুত— ভবঘুরে বা চোর বলে সন্দেহ, প্রহারকারী ও প্রহৃত দুইয়েরই পরস্পর ভাষা বুঝতে বা বলতে না পারার ব্যর্থতা, এমনকি গণপিটুনিকে বৈধতা দিতে পীড়িতের বিরুদ্ধে অসামাজিক কাজের অভিযোগও— এ ক্ষেত্রে যেমন বলা হয়েছে যুবকটি এক মহিলার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছিলেন। কিন্তু এত সন্দেহ ও অভিযোগের যে কোনওটির সুবাদেই যে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে জনতার আদালতে কারও বিচার করার অধিকার জন্মায় না, কারও মুখের কথা বুঝতে না পারায় বা তাতে সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা চলে না: এই গোড়ার কথাটি উন্মত্ত জনতা বুঝতে পারেননি— বুঝতে চাননি বলা চলে। উগ্র জনতা বা ‘মব’-এর আচরণের গোড়ার কথাটিই এই, ভাব ভঙ্গি ভাষা বা জীবনচর্যার কোনও একটি ক্ষেত্রে যে মানুষটি আলাদা, তার অপরত্বকে কাঠগড়ায় তোলা, তার মান-সম্মান ও প্রাণেরও হানি। সন্দেহ ও পূর্বধারণার ইন্ধনে এই গণহিংসা ছড়ায়ও অতি দ্রুত— সমাজমাধ্যমে বিন্দুমাত্র বিচার-বিবেচনা বা সত্য যাচাই না করে কারও চরিত্রহনন যদি এর একটি রূপ, অন্যটি তবে দিনের আলোয় জনসমক্ষে কাউকে দড়ি দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা।

সমাজ-মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, এই অমানবিক আচরণের মূলে রয়েছে সমষ্টি-মানুষের গভীর ও তীব্র এক অনিশ্চয়তার বোধ। চেনা সামাজিক ও মানসিক পরিবেশ পেলে মানুষ আশ্বস্ত হয়, আর অচেনা বা অপরিচিত যে কোনও কিছুতেই জাগে অস্বস্তি, ক্ষোভ, ক্রোধ। এরই সঙ্গে ধরতে হবে সমসময় ও সমাজের পরিস্থিতিও— পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে যে উন্মত্ত জনতার ক্রোধের নানান বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, এই ঘটনাটিকেও তারই সূত্র ধরে পড়া যেতে পারে। হয়তো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জনতার এই উগ্রতা রাজনীতি-প্রভাবিত বা তারই প্রতিক্রিয়ায়; কিন্তু মনে রাখা দরকার, রাজনীতি ছাপিয়ে সমাজজীবনের চেনা ছকেও এই উন্মত্ত হিংসার ঢুকে পড়া কঠিন নয়। তেমন ঘটনার উদাহরণ ভারতের অন্য রাজ্যগুলিতে কম নয়— জাতি বর্ণ ধর্ম-পরিচয় বা পোশাক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনচর্যায় ‘ভিন্ন’ এক বা অনেক নাগরিকের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হচ্ছে আরও অনেক মানুষ। সেই একই জিনিস এ বার ঘটল বহুত্ববাদের প্রতি তার চিরাচরিত ঔদার্য ও সহিষ্ণুতা নিয়ে গর্ব করা পশ্চিমবঙ্গেও— এর চেয়ে দুর্ভাগ্য ও আতঙ্কের আর কী।

আরও পড়ুন