Indian Sailor death at Oman

বিলম্বিত, তবু

যে কথা দেশের মানুষের সামনে বলা হয়নি, প্রধানমন্ত্রী অবশেষে তা বললেন বিদেশের মাটিতে। এই সিদ্ধান্ত যে সচেতন ভাবেই নীত, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ ০৬:৩৫

একেবারে না-হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়াও ভাল— এই লোকপ্রবাদ মনে রেখেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওমান উপসাগরে সম্প্রতি আমেরিকার নৌবাহিনীর হানায় মৃত তিন ভারতীয় নাবিকের প্রসঙ্গ তুললেন, ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে। ভারত অবশ্য এর মধ্যে নাবিক-মৃত্যুর ঘটনায় কূটনৈতিক প্রথামাফিক প্রতিবাদ করেছে। কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী সরাসরি আমেরিকান বিদেশসচিবকে ফোন করেছেন। দিল্লিতে নিযুক্ত উচ্চপদস্থ মার্কিন কূটনীতিককে বিদেশ মন্ত্রকে তলব করে, আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র পেশ করে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার দাবিও জানানো হয়েছে। তবে কূটনীতির নিয়ম-রীতি ও দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রেখে যেমনটি করা দরকার, সব কিছু করার পরেও একটি প্রশ্ন বাকি থেকে যায়। বস্তুত এই নিয়েই বিরোধী দলনেতারা সরব হয়েছিলেন: প্রধানমন্ত্রী এত ভয়ানক একটি ঘটনা নিয়ে সরব হলেন না কেন। কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি ইত্যাদি পেরিয়েও প্রশ্নটি মানবিক অবস্থানের— বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত অবস্থায় আমেরিকার নৌ-হানায় তিন ভারতীয় নাবিক তথা নাগরিকের প্রাণহানি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও করুণ এক ঘটনা। দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশ কিছু স্পষ্ট বক্তব্য আশা করে।

যে কথা দেশের মানুষের সামনে বলা হয়নি, প্রধানমন্ত্রী অবশেষে তা বললেন বিদেশের মাটিতে। এই সিদ্ধান্ত যে সচেতন ভাবেই নীত, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে ভারতবাসী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সঙ্কট-পরিস্থিতিতে দেশের গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা শুনেছেন— অপারেশন সিঁদুর থেকে শুরু করে বৈশ্বিক তেল-সঙ্কট, বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। দেশরক্ষার কাজে বা বিশেষ ‘অপারেশন’-এ সেনাবাহিনীর কারও মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর যে মানবিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে দেশবাসী পরিচিত, ওমান উপকূলে মার্কিন নৌ-হানায় তিন ভারতীয় নাবিকের করুণ মৃত্যুতেও তেমন প্রতিক্রিয়া, সান্ত্বনাবার্তা ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস তাঁর কাছে আশা করা অসমীচীন নয়— অন্তত তিন অকালমৃতের পরিবার-পরিজন সেটুকুর অপেক্ষায় ছিলেন নিশ্চয়। নীরবতা সর্বদাই অর্থবহ, কিন্তু এ-হেন ঘটনার পরেও নীরবতার এই অস্বস্তিকর অর্থটি সকলের কাছে পৌঁছতে পারে— দেশ থেকে বহুদূরে কর্মরত অবস্থায় অপ্রত্যাশিত এই নাগরিক-মৃত্যুও দেশের অবিসংবাদিত অভিভাবককে বিচলিত করছে না; কিংবা যে দেশের হানায় এই মৃত্যু হল, তার সঙ্গে কূটনীতি বাণিজ্য ও অন্য সব সমীকরণের মাপজোখ চলছে বলেই এই মৌনের আশ্রয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বড় বালাই, বিশেষত উল্টো দিকের দেশটির নাম যদি হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপানো বিপুল শুল্ক-ভার, ভারত সম্পর্কে সাম্প্রতিক কালে করা নানা অপ্রীতিকর মন্তব্য, তার সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতি ওয়াশিংটনের স্নেহদৃষ্টি, সবই এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য। উপরন্তু আমেরিকা-ইরান দ্বৈরথ ও বিশেষত হরমুজ়-কাণ্ডের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের উচ্চতাপে পুড়ছে ভারতও, তার আঁচ এসে লাগছে দেশের অর্থনীতিতে। ভারত-আমেরিকা কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিস্থিতি এমনিতেই সুবিধাজনক জায়গায় নেই। সেখানে নৌ-অবরোধ লঙ্ঘনের অভিযোগে বাণিজ্যিক জাহাজে আমেরিকার নৌ-হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুতে তা আরও জটিল হওয়ারই কথা। এই আবহে জি৭ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্যে পশ্চিম এশিয়ায় নিহত ভারতীয়দের প্রসঙ্গ, ওমান উপকূলে ভারতীয় নাবিক-মৃত্যুর কথা উচ্চারণ করা দুই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এক দিকে আমেরিকা-সহ বিশ্বের প্রধান দেশগুলির সামনে একটি বার্তা দেওয়া হল। অন্য দিকে নাবিক-মৃত্যুর ঘটনায় দেশের মধ্যে যে নীরবতা ক্রমেই পুঞ্জিত হচ্ছিল, তারও উত্তর দেওয়া হল। তবে বিদেশে পেশ করা কূটনৈতিক বিবৃতি স্বদেশে পূর্ণ নৈতিক উত্তর হয়ে উঠতে পারে কি না, সে অন্য প্রশ্ন।

আরও পড়ুন