Education System In West Bengal

কলেজছুট

শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় তখনই আগ্রহী হয়, যখন তার স্কুলশিক্ষার ভিত্তিটি মজবুত হয়, এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ থাকে। পশ্চিমবঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই দু’টিরই তীব্র আকাল। এ রাজ্যে এখনও এক বৃহৎ সংখ্যক ছাত্রছাত্রী সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের উপর নির্ভরশীল।

শেষ আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৬ ০৬:৩৩

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে যে উদ্বেগ শিক্ষা-সচেতনদের আলোচনায় উঠে এসেছে, তা যে শুধুমাত্র স্কুলশিক্ষার গণ্ডিতেই আবদ্ধ নেই, বরং উচ্চশিক্ষার পরিসরটিকেও গ্রাস করে ফেলছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। বিধানসভা নির্বাচনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বহু গর্বের উচ্চশিক্ষার চিত্রটি শুধুমাত্র বিবর্ণ নয়, লক্ষণীয় সংখ্যক কম শিক্ষার্থী, স্থায়ী শিক্ষকের অভাব, পরিকাঠামোর অভাব প্রভৃতি নিয়ে ঠিক সরকারি স্কুলশিক্ষার পথেই হাঁটতে চলেছে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা-অন্তে ভাল কলেজে ভর্তির দীর্ঘ লাইন, প্রবেশিকা পরীক্ষায় কড়া প্রতিযোগিতার চেনা ছবি এখন আর প্রায় দেখাই যায় না। প্রথম সারির কলেজেও বিভিন্ন বিষয়ে পঞ্চাশ-ষাট শতাংশ আসন ফাঁকা থাকাই বাস্তব। আশ্চর্যের বিষয়, এরই মধ্যে চালু হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী আমেরিকার ধাঁচের পাঠ্যক্রম গড়ে তোলার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষাকে ভবিষ্যৎমুখী করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে, ভারতীয় ঐতিহ্যকে উচ্চ-শিক্ষার্থীর মধ্যে চারিয়ে দিতে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগ আছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলে নির্বাচনী ময়দানে চমক দেওয়ার কৌশলও আছে। যা নেই, তা হল— উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে পড়া আর পড়ানোর পরিবেশটি।

শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় তখনই আগ্রহী হয়, যখন তার স্কুলশিক্ষার ভিত্তিটি মজবুত হয়, এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ থাকে। পশ্চিমবঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই দু’টিরই তীব্র আকাল। এ রাজ্যে এখনও এক বৃহৎ সংখ্যক ছাত্রছাত্রী সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের উপর নির্ভরশীল। অথচ, স্কুলগুলির অধিকাংশের অবস্থাই শোচনীয়। যে রাজ্যের স্কুলগুলিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে স্কুলছুটের হার ভারতে সর্বাধিক, প্রায় ২০.৩ শতাংশ, সেখানে তার প্রভাব উচ্চশিক্ষার উপর পড়তে বাধ্য। পশ্চিমবঙ্গে সেটাই হয়েছে। স্কুলছুট আটকাতে রাজ্য নানাবিধ প্রকল্পও এখানে যথেষ্ট প্রতিপন্ন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ট্যাবের টাকা বা সাইকেল পাওয়ার পর স্কুলে আসা ছেড়েছে শিক্ষার্থীরা। অন্য দিকে, কর্মসংস্থানের চিত্রটিও দীর্ঘ দিন যাবৎ ভয়ঙ্কর। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অনুযায়ী কাজের সুযোগ এ রাজ্যে অত্যন্ত সীমিত। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ এক সময় বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষকতার পেশা বেছে নিতেন। এই দুই ক্ষেত্রেই নিয়োগ জট সেই সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। ফলে স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদেরও যে সমস্ত সরকারি খালি পদের জন্য আবেদন জমা দিতে হচ্ছে, প্রায়শই দেখা যাচ্ছে তা তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা চার বছর ধরে উচ্চশিক্ষার সাধনা না করে পূর্বেই ছোটখাটো কাজ খুঁজে নিচ্ছে।

এর প্রেক্ষাপটে তৃণমূল সরকারের উপলব্ধি করা জরুরি যে, বাজেট বক্তৃতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাবৃদ্ধির কৃতিত্ব দাবি করে আর নির্বাচনী প্রচারে আরও খানকয়েক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আশ্বাস দিলেই রাজ্যের উচ্চশিক্ষার চিত্রটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না। প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রবল তাগিদে অবস্থা এমনও দাঁড়াতে পারে, যেখানে খানকয়েক ক্লাসঘর, হাতেগোনা শিক্ষার্থী, একটি অফিস ও একটি উপাচার্যের কক্ষ নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়কে কাজ চালাতে হয়। উপাচার্য নিয়োগের টানাপড়েনে আটকে থাকে গবেষণায় অর্থবরাদ্দ। গত কয়েক বছরে কলেজগুলিতে ভর্তি প্রক্রিয়া নানাবিধ জটের কারণে দেরিতে সম্পন্ন হয়েছে, পরিবর্তিত পাঠ্যক্রমও শিক্ষার্থীদের উপর চাপ অনেক গুণ বৃদ্ধি করেছে। উচ্চশিক্ষায় এক জন শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করার মতো কোন বিষয়টিই বা বর্তমানে এ রাজ্যে রয়েছে? ঢালাও নম্বরের সুযোগ আর ভাতার ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রের মূল ত্রুটিগুলিকে ঢাকতে পারে না। আরও এক বার ভোটের ঝুলি নিয়ে নাগরিকদের সামনে দাঁড়ানোর আগে শাসক দল এ বিষয়ে এক বার অন্তত ভাববে কি?

আরও পড়ুন