কাজ চলছিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, নতুন বছরে আলোকরেখা দেখা গেল। ‘লেওনার্দো দা ভিঞ্চি ডিএনএ প্রোজেক্ট’ বিজ্ঞান-প্রকল্পের এক বিজ্ঞানী নোরবের্তো গনজালেস-হুয়ারবে সদ্যপ্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানালেন, রেনেসাঁস যুগের শিল্পীর ডিএনএ ‘সম্ভবত’ এ বার বিজ্ঞানের অধিগত হল। শিল্পীর আঁকা একটি ছবি এবং তাঁর এক আত্মীয়ের লেখা চিঠি, এই দুই ‘স্যাম্পল’ থেকে দীর্ঘ আয়াসে পাওয়া গেছে ‘ডিএনএ ট্রেস’। ‘হোলি চাইল্ড’ নামের ছবিটি লেওনার্দোর আঁকা বলেই কথিত, লাল চক দিয়ে আঁকা ছবিটিতে ডিএনএ-র ছিটেফোঁটা রয়ে গিয়েছে কয়েক শতাব্দী পরেও। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পীর এক আত্মীয়ের একটি চিঠি থেকে পাওয়া ডিনএ, তাদের ওয়াই-ক্রোমোজ়োম সিকুয়েন্সিং শেষে দেখা গেছে, দুই ডিএনএ-ই মিলে যাচ্ছে এমন এক জিন-গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে, যাঁদের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন টাস্কানি-তে, লেওনার্দোর যা জন্মভূমি। তবে ছবির ডিএনএ যে লেওনার্দোরই তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যেত যদি সরাসরি তাঁর ডিএনএ-র সঙ্গে এর তুলনা করা যেত: সে উপায় নেই কেননা লেওনার্দোর প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী কেউ নেই, উপরন্তু ওঁর সমাধিস্থলের উপরে সেই উনিশ শতকেই নানা হস্তক্ষেপ হয়েছে— মাটি খুঁড়েও কিছু পাওয়া যাবে না। তবু, জিন ও ডিএনএ নিয়ে গবেষণায় আজকের বিজ্ঞান এতই এগিয়েছে যে এই ‘সম্ভাবনা’র প্রাপ্তিটুকুও বিরাট।
কোথায় তার বিরাটত্ব? প্রথমত, ডিএনএ-তেই লুকিয়ে ব্যক্তি মানুষের সমষ্টির শিকড়। সুদূর অতীত বেয়ে আজ পর্যন্ত তার পারিবারিক, গোষ্ঠীগত ও কৌম শিকড় যেখানে যেখানে চারিয়ে গিয়েছে, তার বিজ্ঞানসম্মত মানচিত্রটি ডিএনএ-গবেষণায় তৈরি করা সম্ভব। পাশ্চাত্যে এই মুহূর্তে তা হচ্ছেও: দেশে দেশে সরকারি ও অসরকারি স্তরে রয়েছে বহু পেশাদার ও স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ নাগরিকেরা সেখানে ডিএনএ স্যাম্পল জমা দিয়ে নিজেদের জিনগত ‘ফ্যামিলি ট্রি’র সন্ধান পেতে পারেন; জানতে পারেন, শত শত বছর ধরে কী ভাবে বিবাহ ও অন্য নানা সূত্রে পূর্বজদের জিন মিলিত, পরিবাহিত ও প্রসারিত হয়েছে বিচিত্র অভিমুখে। আজকের অপরাধবিজ্ঞানে ডিএনএ-র ভূমিকা বিরাট; অজ্ঞাতপরিচয় মৃতের পরিচয় নির্মাণে এবং অপরাধী তথা খুনিকে ধরতে ডিএনএ-কে কাজে লাগাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা নিয়ামকরা, বৃহত্তর অর্থে তা নাগরিকের ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত। এ তো গেল সাধারণ মানুষের কথা, খ্যাতনামা বা মনীষীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই তার গুরুত্ব আরও। কোনও জাতি বা দেশ তার উজ্জ্বল নক্ষত্রদের ডিএনএ সংরক্ষণ করে রাখতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে, ‘সেলেব্রিটি ডিএনএ ডেটাবেস’ বা ‘জিন মিউজ়িয়ম’ সাংস্কৃতিক গর্বের বস্তু হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণা শেষে জানাচ্ছেন বিচিত্র সব সত্য, যা ভেঙে দিচ্ছে সযত্নলালিত মিথ— শ্বেতাঙ্গ একনায়কের জিনগত শিকড় মিলছে অতীতের কৃষ্ণাঙ্গ দাসের জিনে; এমনই আরও বহু উদাহরণ দেওয়া যায়।
শিল্পের দুনিয়াতেও ডিএনএ-গবেষণার গুরুত্ব যারপরনাই। বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের বহুমূল্য শিল্পকর্ম জাল হওয়ার ঘটনা শোনা যায় প্রায়ই, বিজ্ঞান ও ডিএনএ-গবেষণা এ ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা রাখে। ঐতিহাসিক ও প্রাচীন শিল্পকর্মের মধ্যে অজানতেই রক্ষিত থাকতে পারে শিল্পকর্মগুলির সমকালীন পরিবেশের ডিএনএ— কে বা কারা সেই শিল্পকর্মটি তৈরি করেছিল, কী কী উপকরণ তার নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল, শিল্পবস্তুটি দীর্ঘকাল ধরে কত হাত বা কোন কোন পরিবেশ ঘুরেছে, ইত্যাদি। বিজ্ঞানীদের কাজটি যে কত কঠিন তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে: লেওনার্দো দা ভিঞ্চির ছবির ক্ষেত্রে তার প্রাচীনত্ব, এত শতাব্দী ধরে তার নাড়াচাড়ায় অন্য কতশত ডিএনএ-ট্রেস’এর সঙ্গে শিল্পীর ডিএনএ-র মিশ্রণ তথা ‘দূষণ’ হয়েছে তা ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়, এই বিমিশ্র ডিএনএ-সমুদ্র থেকে একটি একটি করে অপ্রয়োজনীয় ডিএনএ বাদ দিতে দিতে তাঁরা অখণ্ড মনোযোগে এগিয়েছেন লক্ষ্যের দিকে। আবার অপ্রয়োজনীয় ডিএনএ-ও মোটেই ফেলনা নয়— লেওনার্দোর ছবি থেকেই বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন নানান ব্যাক্টিরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস ও উদ্ভিদেরও ডিএনএ-ট্রেস, যা থেকে ধারণা করা যেতে পারে ছবিটির উপকরণ, সংরক্ষণের পরিবেশ ও প্রণালী সম্পর্কে, আগেই যা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু শিল্পীর পরিচয় ও নৃতাত্ত্বিক শিকড়ই নয়, তাঁর সমকালীন সংস্কৃতি ভূতত্ত্ব পরিবেশবিজ্ঞান, সবই জানা যেতে পারে ডিএনএ-গবেষণায়। একটিমাত্র গবেষণায় এতগুলি সত্যের উপহার— বিজ্ঞানই দিতে পারে কেবল।