রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে, প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়। কিন্তু কলকাতা শহরের কিছু স্থানের দুরবস্থা-চিত্রটি বিন্দুমাত্র পাল্টায় না। ব্রিগেড ময়দান সেই তালিকার অন্যতম। সম্প্রতি রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের জন্য ব্রিগেড ময়দানকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। সুসজ্জিত ময়দানে সে দিন উপস্থিত ছিলেন অগণিত মানুষ। কিন্তু ‘চাঁদের হাট’ ভেঙে যাওয়ার পরেই স্পষ্ট হয় ব্রিগেডের হতশ্রী দশাটি। অসমান জমি, কাদা, অস্থায়ী কাঠামোর চিহ্ন নিয়ে ব্রিগেড ময়দান ফিরেছে তার পুরনো অবস্থানেই, যা প্রায় প্রতি সমাবেশের পর কলকাতাবাসীর পরিচিত দৃশ্য। সংবাদে প্রকাশ, জঞ্জাল সরানোর ব্যবস্থা হচ্ছে, সরছে অস্থায়ী কাঠামোও। কিন্তু বাস্তুতন্ত্রের তাতে সুরক্ষা হয় কি? একটি দিনের জন্যই যে ক্ষতি হয় মাঠের সবুজের, মাটির বাস্তুতন্ত্রের, অত সহজে— কেবল জঞ্জাল সরালেই— সেই ক্ষতি পূরণ হয় কি? আসলে, এ দেশের পরিবেশ ভাবনার গোড়ায় গলদ। আগে ক্ষতি করে তার পর সেই ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা কোনও ভাবেই সুফল দিতে পারে না। ইংল্যান্ড আমেরিকার মতো দেশেও নির্বাচন হয়, তার প্রচার হয়, ভোটের সাফল্য উদ্যাপিত হয়। কিন্তু মাঝখান থেকে পরিবেশের বারোটা বাজানোর মতো কিছু ঘটে না— কেন? কেন, সেটা এই দেশের সরকারি মহলগুলি একটু ভেবে দেখতে পারে কি?
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে ‘প্রশাসন’ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছে। সেই প্রশাসনের যাত্রারম্ভটি পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিয়ে শুরু করা যায় কি? স্লোগানের ঢেউ তুলতে, দাবিদাওয়া জানাতে, জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে শক্তি প্রদর্শনে ‘ব্রিগেড চলো’র আহ্বান যেমন বঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলির মুখে অহরহ শোনা যায়, সেই একই আগ্রহ ময়দানের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখায় দেখা যায় না। নিজ স্বার্থে ব্যবহারের পর ভুলে যাওয়া— রাজনীতির পরিচিত লক্ষণ। ব্রিগেড ময়দানের প্রতি ধূলিকণা তার মর্মার্থ জানে। শুধুমাত্র জঞ্জাল সরালেই ময়দান বাঁচবে না। অবিলম্বে সভা-সমাবেশের অত্যাচার থেকে তাকে মুক্ত করা জরুরি। কলকাতার মতো ধূলিধূসরিত শহরে ময়দানের সবুজের গুরুত্ব অপরিসীম। ময়দানের সামগ্রিক দূষণমুক্তি কোন পথে হবে, অবিলম্বে নতুন প্রশাসনকে ভাবতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প সমাবেশ স্থান বেছে নিতে হবে।
এক সময় জাতীয় পরিবেশ আদালত ব্রিগেডে শর্তসাপেক্ষে সভা করার অনুমতি দিয়েছিল। অতঃপর পরিবর্তন যেটুকু হয়েছে, তা হল— সমাবেশের পরই পুরসভার জঞ্জাল অপসারণ বিভাগ আবর্জনা পরিষ্কারের কাজটি শুরু করে দেয়। কিন্তু তা নিয়েও ‘আমরা-ওরা’র রাজনীতি বন্ধ হয়নি। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, ব্রিগেডে শাসক দলের সভা-অন্তে সে দিনই জঞ্জাল পরিষ্কারে তৎপর হয় পুরসভার কর্মী-বাহিনী, যে তৎপরতা বিরোধীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এ প্রসঙ্গে সমস্ত দলের প্রতি দাবি, সমাবেশের পর সেই স্থানকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতেই হবে। তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা পরিবেশ নষ্ট করবেন, আর তাকে রক্ষা করবে অন্যরা— উষ্ণায়নের প্রবল বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এই ধ্বংসাত্মক মানসিকতা অবিলম্বে পরিত্যাগ করতে হবে। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যেটুকু সবুজ বেঁচে আছে, তাকে প্রাণপণে রক্ষা করতে হবে। প্রশাসনকে, নাগরিককেও। এর সূচনাটিও নাহয় ব্রিগেডের হাত ধরেই হোক।