Iran-Israel Situation

রক্তসিঞ্চন

সে সব শর্ত ভেসে গিয়েছে সৌপ্তিক পর্বে, যেখানে শিবিরে নিদ্রিতদের নির্বিচারে হত্যা করছেন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। সে ছিল ক্ষিপ্ত পরাজিতের প্রতিশোধ-স্পৃহার প্রকাশ। কুরুক্ষেত্রেও যুদ্ধের শেষ হয়েছিল নিষ্পাপের প্রাণহরণে— এক গর্ভস্থ শিশুর হত্যা দিয়ে।

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:৪৮

ভাল গাছ। শিশুদের স্কুলের জন্য এমন সুন্দর নাম কে ভেবেছিলেন, কে বলতে পারে। তবে আরবি কথা ‘শাজারে তৈয়বা’-র মানে হল ‘ভাল গাছ’, বা ‘পবিত্র গাছ’। শাজারে তৈয়বা স্কুলে পড়াশোনা করত সাত বছর থেকে বারো বছরের মেয়েরা। ইরানে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন, তাই ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার, নতুন সপ্তাহের শুরু হয়েছিল। ঘড়ির কাঁটা সকাল দশটা থেকে এগোচ্ছে পৌনে এগারোটার দিকে, ওনাব সমুদ্রের ধারে মিনাব শহরে ব্যস্ততা-ঘন সময়। স্কুলের ভিতরে একটা পিরিয়ড শেষ হয়ে শুরু হওয়ার ফাঁকে হয়তো ছাত্রীদের মধ্যে চলছিল ফিসফাস, খিকখিক। কৈশোর সব দেশেই তো এক। কথা শেষ হল না, শেষ হয়ে গেল জীবনগুলো। ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে স্কুলে, কালো ধোঁয়ার স্তম্ভ ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠছে, দেখে থেকে ত্রাসে শিহরিত সারা বিশ্ব। সন্তানের জন্মের মুহূর্তে সব বাবা-মায়ের মধ্যে জন্ম নেয় এক ভয়— অকস্মাৎ সন্তান হারানোর। এমন এক-একটা ঘটনার পরে সেই চাপা আতঙ্ক যেন মূর্তি ধরে সামনে এসে দাঁড়ায়। দূর দেশ, অজানা শহরের শোকার্ত মানুষগুলির পাশে মন দাঁড়িয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে। কারা যুদ্ধ বাধাল, আর কাদের জীবন নিমেষে ওই ধ্বস্ত স্কুলবাড়ির মতোই ভগ্নস্তূপ হয়ে পড়ল, সে প্রশ্নগুলো চিন্তাকে একেবারে অধিকার করে বসে। যুদ্ধের নামে এমন নির্বিচার হত্যা যোদ্ধাদের মনেও কি আলোড়ন তৈরি করে না? গুড কিল (২০১৪) ছবিতে সেই ক্ষোভ ধরা পড়েছে। ছবিতে এক জন যুদ্ধবিমান চালক নতুনদায়িত্ব পান, লস অ্যাঞ্জেলেস-এর মরু এলাকায় সামরিক ঘাঁটিতে বসে ড্রোন চালিয়ে বোমা ফেলার, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়ার মতো নানা দেশে। কেবল সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটিই হয় লক্ষ্য এমন নয়, সিআইএ-র কাছে প্রায়ই বোমার লক্ষ্য হয় কোনও বিয়ের উৎসব, কিংবা মৃত আত্মীয়ের স্মরণসভা, যেখানে কোনও বড় সন্ত্রাসবাদী আসতে পারেন বলে খবর রয়েছে। সেই এক জনকে মারতে গিয়ে প্রেম-উদ্ভাসিত বর-বধূ, আনন্দরত শিশু, আপ্যায়িত অতিথি— কত শত মানুষকে নিমেষে শেষ করে দেয় একটি বোমা।

“যদি কখনও শত্রুর মুখোমুখি না দাঁড়াতে পারো, তা হলে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াবে কী করে?” গুড কিল ছবির একটি বিখ্যাত সংলাপ। দিনের পর দিন পরিকল্পিত নিধনের অনৈতিকতা বিপর্যস্ত করে বিমানচালককে। সে বার বার ফিরতে চায় বিমানযুদ্ধে। কারণ, সম্মুখযুদ্ধে প্রতিপক্ষও লড়াইয়ের একটা সুযোগ পায়। যে যোদ্ধা বসে রয়েছে সাত হাজার মাইল দূরে, তাকে বাধা দেওয়ার সুযোগ কোথায়? যে যুদ্ধে আঘাতের লক্ষ্য মানুষটি সম্পূর্ণ অসহায়, আত্মরক্ষার উপায়হীন, আর যোদ্ধা সম্পূর্ণ নিরাপদ, ঝুঁকিহীন, সে যুদ্ধ কি কোনও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এ প্রশ্ন অতি প্রাচীন। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের আগে অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, কিরাতরূপী পশুপতি তাঁকে যে মহাস্ত্র দান করেছেন তাতে তিনি একাকীই নিমেষমধ্যে ত্রিলোক সংহার করতে পারেন, কিন্তু দিব্য অস্ত্র দ্বারা যুদ্ধে লোক হত্যা অনুচিত। তাই তিনি সরল উপায়েই যুদ্ধ করবেন। যুদ্ধের শুরুতে দু’পক্ষের সম্মতিতে নিয়ম তৈরি হচ্ছে, অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে রত, শরণাগত, যুদ্ধে বিমুখ, অস্ত্রহীন বা বর্মহীন লোক, ভেরিবাদক, ভারবাহকদের কখনও মারা হবে না। রথীর সঙ্গে রক্ষী, অশ্বারোহীর সঙ্গে অশ্বারোহী, পদাতিকের সঙ্গে পদাতিক যুদ্ধ করবে।

সে সব শর্ত ভেসে গিয়েছে সৌপ্তিক পর্বে, যেখানে শিবিরে নিদ্রিতদের নির্বিচারে হত্যা করছেন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। সে ছিল ক্ষিপ্ত পরাজিতের প্রতিশোধ-স্পৃহার প্রকাশ। কুরুক্ষেত্রেও যুদ্ধের শেষ হয়েছিল নিষ্পাপের প্রাণহরণে— এক গর্ভস্থ শিশুর হত্যা দিয়ে। আর এ বার পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরুই হল প্রায় দেড়শো শিশুকন্যার হত্যাকাণ্ড দিয়ে। সব তথ্য, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কানে ঢোকার পরেও মন প্রশ্ন করে, এ কেমন যুদ্ধ, যেখানে যোদ্ধারা থাকে আড়ালে, আর ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে শিশুদের মাথায়? ইরানের স্কুলটিই বিরোধীদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল, না কি স্কুলকে নৌসেনার ঘাঁটি বলে ভুল করেছে আমেরিকা-ইজ়রায়েল, অথবা ইরানেরই ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে স্কুলের উপর, বিতর্ক চলছে। নেতারা বলেন, সামরিক ঘাঁটিই অস্ত্রের লক্ষ্য, কিন্তু টিভির পর্দায় বার বার দেখা যায়, জনপদই হয়ে উঠেছে যুদ্ধক্ষেত্র। গত বছর গাজ়ায় প্রতিনিয়ত স্কুল, হাসপাতাল, ত্রাণশিবির, খাবার বিতরণের শিবিরের উপর আছড়ে পড়েছে বোমা। এ বছর দোহা, দুবাই, আবু ধাবি, বেরুট, তেহরানে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে শ্বাসরুদ্ধ, কখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। পবিত্র গাছে রক্তসিঞ্চন— যুদ্ধের বিধিলিপি।

আরও পড়ুন