মন্দিরের বিগ্রহ বা বিগ্রহের অলঙ্কার চুরি, প্রণামী বা অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ-এর ঘটনা ভারতে নতুন নয়। তিরুপতি, পদ্মনাভস্বামী মন্দির, শবরীমালাতেও এমন ঘটনা দেখা গিয়েছে। কিন্তু অযোধ্যায় রামমন্দিরের অনুদান চুরি যাওয়ার বিষয়টিকে এগুলির সঙ্গে এক সারিতে মেলানো যায় না। শ্রী রামজন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট একটি বেসরকারি সংগঠন, যাকে রাষ্ট্র অত্যন্ত বিরল ভাবে বিপুল ও গুরুত্ববহুল এক জনদায়িত্ব অর্পণ করেছিল। এই দায়িত্ব একাধারে অর্থনৈতিক ও নৈতিক। কারণ কোটি কোটি টাকার প্রণামী ও অনুদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেই সঙ্গে লক্ষ কোটি ভারতবাসীর আবেগ ও আস্থা রক্ষার দায়ও রয়েছে। দায়িত্বটি আধা-রাজনৈতিকও, কারণ এই মন্দির শাসক দলের আদর্শ ও তিন দশকব্যাপী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ।
অভিযোগ অপ্রত্যাশিত নয়। মন্দির নির্মাণ শুরুর আগেই জমি কেনাবেচা বিতর্কে ট্রাস্টের কয়েক জন সদস্যের নাম জড়িয়েছিল। সতর্ক করা হয়েছিল, শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা জরুরি। সতর্কবার্তা যেমন গুরুত্ব পায়নি, তেমনই মন্দির পরিচালনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বহুল প্রচারিত ‘দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা’র প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা গেল না কেন, সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। প্রতি দিন হাজার হাজার ভক্ত যেখানে অর্থ দান করেন, সেখানে এত দিন অসঙ্গতি নজরে এল না— সে প্রসঙ্গও বিস্ময়কর। সব মিলিয়ে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশাসনিক ব্যর্থতার নজির। এর ফলে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও সুরক্ষা নিয়েই জনমানসে সংশয় উপস্থিত। বদ্রীনাথেও প্রণামী চুরির অনুরূপ অভিযোগে অনাস্থা বাড়ছে। অযোধ্যায় তদন্তকারী দলের প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের বিষয় জানা গিয়েছে, কয়েক জন নিচুতলার কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু, উচ্চ পর্যায়ের গাফিলতি ছাড়া এত বড় অঙ্কের অর্থ সরানো সম্ভব কি না, চুরির দায় কিছু ব্যক্তির কাঁধে চাপিয়ে উচ্চপদস্থদের আড়াল করা হচ্ছে কি না, সেই সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। অতএব, বিশ্বাস ফেরানোর প্রথম ধাপ হল আইনি প্রক্রিয়া যেন শীর্ষ স্তর পর্যন্ত পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করা। কারা সুবিধাভোগী, অর্থ কোথায় গিয়েছে— উত্তরগুলি খোঁজা দ্বিতীয় ধাপ। প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার অজুহাতে কোনও ভাবেই যেন তদন্তের গতি ও পরিধি বাধাপ্রাপ্ত বা প্রভাবিত না হয়। এতে অবিশ্বাস জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয় ধাপের লক্ষ্য হবে পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, তার সদুত্তর দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
মূল তর্কটি ধর্মীয় নয়, বরং আস্থা-ঘটিত এবং আইন-বিষয়ক। গণতন্ত্রে কোনও ব্যক্তি, ট্রাস্ট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিশেষত যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনতার বিশ্বাস ও জনসম্পদ অর্পিত হয়েছে তাদের দায় সর্বোচ্চ। অতএব, জবাবদিহি নিয়েও আপস নয়। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে, তদন্তে কর্তাব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ বিষয়ে আদালতের তত্ত্বাবধান, স্বাধীন ফরেন্সিক অডিট-ব্যবস্থা, যে ভাবে প্রয়োজন আইনকে সে ভাবেই এগোতে দিতে হবে। এটি শাসক দলের ‘দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা’ অঙ্গীকারের প্রকৃত পরীক্ষা।