বঙ্গ রাজনীতিতে একের পর এক কদর্যতার অধ্যায় সংযোজিত হচ্ছে। শনিবার উত্তর কলকাতায় প্রমাণিত হল, রাজনীতি প্রকৃত অর্থেই অতল— যত দূর নেমেছে, অবলীলায় তার থেকেও নীচে তলিয়ে যাওয়া সম্ভব। দেখা গেল, ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে যাওয়ার পথে বিজেপি সমর্থকদের আক্রমণের লক্ষ্য তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী, রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়ি। রাজ্যের মন্ত্রীর বাড়িতে সরাসরি আক্রমণের ঘটনা— এ রাজ্যে এই প্রথম। কার দোষ, কে কাকে উস্কানি দিয়েছে, সে তরজা চলতেই থাকবে। কিন্তু প্রবণতাটি স্পষ্ট— নির্বাচনের আগে এই বঙ্গে যে কোনও বিজেপি কর্মসূচিতেই শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা। এবং তার জন্য বিজেপি নেতৃত্বের তরফে কোনও দুঃখপ্রকাশ দেখা যাবে না, কেবল বিপরীত পক্ষের উপর সম্পূর্ণ দোষ চাপানো হবে। মনে পড়তে পারে, কয়েক বছর আগে অমিত শাহের নির্বাচন-পূর্ব ভাষণের পর বিজেপি সমর্থকরা যখন বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিলেন, তখনও তাঁর মুখে তার তিলমাত্র নিন্দা শোনা যায়নি। ২০২৪ সালে বিজেপির নবান্ন অভিযানের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘটনাতেো কোনও বিরোধী দলনেতা কর্মীদের আচরণের নিন্দা করেননি। বিজেপির কর্মীরা বিলক্ষণ জানেন, তাঁদের হিংসাত্মক কার্যক্রম স্বীকৃতি পাবে। সেই কারণেই তাঁরা নতুনতর হিংস্রতায় বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না— রাজ্যের এক মহিলা মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার ঘটনায় তা স্পষ্ট। যে দলের নেতা দিল্লি থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গের ‘জঙ্গলরাজ’-এর নিন্দা করে যান, সে দলের কর্মীদের এই আচরণ কী বুঝিয়ে দেয়, তা বঙ্গসমাজকেই বুঝে নিতে হবে।
প্রশ্ন উঠছে, এই ঘটনার সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী কোথায় ছিল? নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষিত হওয়ার আগে থেকেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এত বড় হিংসা ঘটল কী করে? আবার, পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব প্রধানত কলকাতা পুলিশের। পরের প্রশ্ন, পুলিশই বা কী করছিল? বিস্মিত হতে হয় দেখে যে, পুলিশবাহিনীর সাক্ষাৎ উপস্থিতিতেই তাণ্ডব চলেছে, খোদ মন্ত্রীর বাড়ি বিপন্ন হয়েছে। অবশ্য, এত দিনে পুলিশের এই ‘ব্যর্থতা’র সঙ্গে রাজ্যবাসী বিলক্ষণ পরিচিত। প্রতি বার এমন ঘটনার পর যা দাবি করা হয়, সেটাই আবার বলা জরুরি— অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেফতার করা হোক, দ্রুত তদন্তের নিষ্পত্তি হোক। সে কাজে রাজনৈতিক রং বিবেচনা করার কোনও প্রশ্ন যেন না ওঠে। কোন পক্ষ উস্কেছে, কে প্রথম হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে, তা যেন একমাত্র বিবেচ্য না হয়। বিপক্ষের প্ররোচনায় পা দিয়ে যারা এমন হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, প্ররোচনার যুক্তিটি তাদের কাছে অজুহাতমাত্র। হিংসাত্মক পরিস্থিতি আটকানোর কাজ কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনীর নয়, রাজ্যের শৃঙ্খলারক্ষায় পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্বই সর্বপ্রথম, নির্বাচন-কালীন বিধি চালু হওয়ার পরও।
সবশেষে একটি কথা। রাজ্য-রাজনীতিকে এই কলুষ থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব কেবল পুলিশের নয়, কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনীর নয়। সমর্থকবাহিনীর মর্জির উপরও তা নির্ভর করতে পারে না। এই বিশৃঙ্খলা, হিংস্রতার রাজনীতির বেসাতি করতে করতে রাজনৈতিক দলসমূহ গণতন্ত্রকে যে বিকৃতির দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য দল মনে রাখুক— কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব কিন্তু প্রথমত এবং প্রধানত দলীয় নেতৃত্বেরই। সে নিয়ন্ত্রণের চিহ্নমাত্র এখনকার বঙ্গ-রাজনীতিতে নেই। বস্তুত, এর মধ্যে কেউ একটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিকল্পনারও ইঙ্গিত খুঁজে পেতে পারেন। কর্মীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন, যথেচ্ছ হিংস্রতা করবেন, এবং তার পর পুলিশে বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা কিংবা পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠবে। শাসক বা বিরোধী, যে কোনও পক্ষই যদি এই চূড়ান্ত স্বার্থপর ও সংকীর্ণ লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকে, তাতে সর্বাপেক্ষা বড় দুর্ভাগ্যের ভাগী হবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটিই।