Rahul Arunodoy Banerjee Death

নিরুত্তর

যে কোনও মানুষের মৃত্যুমাত্রই বেদনার। জনপ্রিয় অভিনেতার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু সেই বেদনাকে আরও গাঢ় করেছে, নিয়ে এসেছে জনপরিসরের আলোচনা ও সমাজমাধ্যমের জল্পনার কেন্দ্রে।

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৫

কোথায় কখন মৃত্যু আসবে তা বলা যায় না, নিয়তিতত্ত্ব পেরিয়েও এ কথা সহজ সত্য। কিন্তু অনেকের উপস্থিতিতে, বহু মানুষের চোখের সামনে কোনও মৃত্যু ঘটে গেলে এই প্রশ্ন জাগতে বাধ্য— কেন, কী ভাবে তা ঘটল। তালসারির সমুদ্রে টিভি সিরিয়ালের শুটিংয়ে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে এই অবধারিত প্রশ্নটি সকলের মুখে উঠে আসছে, এক মুহূর্তে এমন কী ঘটে গেল যে, একটু আগেও যিনি শুটিং-দলের সকলের সঙ্গে কথা বলছিলেন, সমুদ্রের পাড়ে ক্যামেরায় অন্য শট দিচ্ছিলেন, তাঁরই প্রাণহীন দেহ উদ্ধার করতে হয় সমুদ্রের বুক থেকে! কাজ করতে করতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা কম নয়, অভিনয়-জগতেও তেমন উদাহরণ অনেক, কিন্তু এই ঘটনাটি স্তম্ভিত করে তার আকস্মিকতায়: ‘ছিল, নেই— মাত্র এই’?

যে কোনও মানুষের মৃত্যুমাত্রই বেদনার। জনপ্রিয় অভিনেতার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু সেই বেদনাকে আরও গাঢ় করেছে, নিয়ে এসেছে জনপরিসরের আলোচনা ও সমাজমাধ্যমের জল্পনার কেন্দ্রে। সেই সঙ্গে জন্ম দিয়েছে একগুচ্ছ প্রশ্নের, ঘটনার পর তিন দিনেরও বেশি সময় কেটে গেলেও যে প্রশ্নগুলির সর্বাংশে উত্তর মেলেনি। শুটিং ইউনিটের নানা সদস্যের ভিন্ন ভিন্ন বয়ানে গোড়া থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, এমনকি এও বলা হয় যে শুটিং চলছিল না, অভিনেতা নিজে সমুদ্রের দিকে চলে গিয়েছিলেন। সেই অ-সত্য পেরিয়ে যদি বা জানা গেল যে নিশ্চিত ভাবেই সমুদ্রের মধ্যে শুটিং চলছিল, অভিনেতার সঙ্গে ছিলেন সহশিল্পী যিনি নিজেও জলের মধ্যে পড়ে যান এবং তাঁকে লোকজন উদ্ধার করেন, সে ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন ওঠে: অভিনেতাকে উদ্ধার করতে কি তবে দেরি হয়েছিল? কেন এই দেরি? দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া, অভিনেতাকে উদ্ধার করা এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া— এই তিন ঘটনার মধ্যে যে অমূল্য সময় এবং একটি প্রাণ চলে গেল, তার হিসাব কারা দেবেন? শুটিং দল এবং প্রযোজনা সংস্থার নানাজনের তথ্যে এত ফাঁক কেন?

এই সব প্রশ্নের দ্রুত ও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া জরুরি। তবে আরও জরুরি এই বাস্তবসত্যকে স্বীকার করা যে, এই দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পিছনে রয়েছে এক কাণ্ডজ্ঞানহীন অসতর্কতা, এক ভয়ঙ্কর নিয়মলঙ্ঘন। আউটডোর শুটিংয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এক নিঃশর্ত শর্ত, সমুদ্র পাহাড় জঙ্গল থেকে শুরু করে যে কোনও ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ-প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। তালসারির সমুদ্রে ঢেউয়ের মধ্যে নৌকায় শুটিং হচ্ছে আর লাইফ জ্যাকেট, লাইফবোট ইত্যাদির নামগন্ধ পর্যন্ত নেই, স্থানীয় থানা, উপকূলরক্ষী বাহিনী বা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুমতির অপেক্ষা করা হয়নি, সমুদ্রের ওই অংশের বিপদ যাঁরা কাছ থেকে জানেন সেই স্থানীয় মানুষ বা প্রশিক্ষিত নুলিয়ার সাহায্য পর্যন্ত নেওয়া হয়নি— এই ভয়াবহ তথ্যগুলি এর মধ্যে উঠে এসেছে। এই সব কিছুর ব্যবস্থা করা প্রযোজনা সংস্থার দায়িত্ব, এবং কোনওটিই করা হয়নি: চরম অব্যবস্থা ও অপেশাদারিত্বের জেরে একটি জীবন চলে গেল। এ কথা ভেবেও আতঙ্ক হয়, বাংলায় বিনোদন-জগতের শুটিং ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার চিত্রটি কি তা হলে এমনই, দিনের পর দিন এই পরিস্থিতিতেই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজ করে চলেছেন? অভিনয়শিল্পীদের তো নিজস্ব সংগঠন রয়েছে; তাঁদের কি কিছু বলার দায় নেই, কোনও অভিযোগ নেই? না কি রাজনীতিকদের কাছে বঙ্গীয় শিল্পী-অভিনেতৃদের একাংশের মাথা নত করার যে ‘সংস্কৃতি’ চার পাশে চোখে পড়ে, এই নীরবতাও তারই পরোক্ষ ফল— বেশি উচ্চবাচ্য করলে কাজ হারানোর, একঘরে হওয়ার ভয়? প্রশ্ন উঠছে পুলিশি তদন্ত নিয়েও— ঘটনার পরে এতটা সময় কেটে গেলেও সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া তদন্তের আর কী অগ্রগতি হয়েছে, তার খবর প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। প্রশ্ন অনেক, উত্তরগুলি অজানা। ভয় হয়, পরস্পর দোষারোপ ও দায় এড়ানোর ঘূর্ণিতে পড়ে তাদেরও না সলিলসমাধি ঘটে!

আরও পড়ুন