India-China Relations

পথের কাঁটা

রাষ্ট্রপুঞ্জের সুরক্ষা পরিষদের সদস্যপদ পনেরোটি। এর মধ্য পাঁচটি স্থায়ী পদ, যাতে আসীন আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চিন। বাকি দশটি অস্থায়ী পদে দু’বছরের জন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নির্বাচন হয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভা দ্বারা।

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:১৭

আপাতত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পরিস্থিতি স্থিতিশীল। সম্পর্কের টানাপড়েনও কিছু স্তিমিত। বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার লক্ষ্যে হালে কিছু মৌখিক ইঙ্গিতও মিলছে চিনের তরফে। সম্প্রতি সেই ভাবনাই যেন অনুরণিত হল ভারতে আসা চিনের প্রধান উপ-বিদেশমন্ত্রী মা ঝাওশু-র বক্তব্যে, যখন তিনি বললেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের আকাঙ্ক্ষাকে চিন বোঝে এবং সম্মান করে। প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছে ব্রিকস শেরপা বৈঠকের মাঝে ভারতীয় বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রী-র সঙ্গে তাঁর ভারত-চিন কৌশলগত সংলাপের সময়। আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিবিধ বিষয়েও মতবিনিময় হয়। তবে ঝাওশু-র বক্তব্যে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রসঙ্গটি আবারও উস্কে দিয়েছে এমন একটি বিষয়কে, যা কয়েক দশক ধরে ভারতীয় বিদেশনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের সুরক্ষা পরিষদের সদস্যপদ পনেরোটি। এর মধ্য পাঁচটি স্থায়ী পদ, যাতে আসীন আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চিন। বাকি দশটি অস্থায়ী পদে দু’বছরের জন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নির্বাচন হয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভা দ্বারা। ভারত এই অস্থায়ী পদে বেশ কয়েক বার নির্বাচিত হয়েছে বটে, কিন্তু স্থায়ী পদে যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সুযোগ রয়েছে, তা নেই অস্থায়ী সদস্যপদে। আসলে, স্থায়ী সদস্যপদের ধারাবাহিকতা এবং ভেটো-ক্ষমতা দুই-ই রয়েছে। এর ফলে কোনও প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত হওয়া সত্ত্বেও, তা একতরফা ভাবে আটকাতে পারে এই পদাধিকারী রাষ্ট্রগুলি। স্থায়ী পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের যুক্তি, তার উপস্থিতি বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিষদের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে কারণ বর্তমানে দিল্লি সেই সব আঞ্চলিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে, যেগুলোকে সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দিল্লির দাবি, জলবায়ুর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, ন্যায্য বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের মতো বিষয়গুলিতে অনেক দেশ ভারতকে তাদের স্বার্থের জন্য ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর একটি বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর হিসাবে মনে করে। তাই ভারতের জন্য এই আসন গুরুত্বপূর্ণ।

এ দিকে, ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য বাকি রাষ্ট্রগুলি, বিশেষত রাশিয়া দিল্লিকে সমর্থন করলেও, তাতে কোনও কালেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সায় দেয়নি চিন। বস্তুত, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে, রাষ্ট্রপুঞ্জে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক প্রচেষ্টায়, বিশেষত সন্ত্রাসবাদ দমন এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ-সম্পর্কিত বিষয়ে, চিন একটি ধারাবাহিক বাধা হিসেবেই কাজ করে আসছে। আসলে, গ্লোবাল সাউথ তো বটেই, বিশ্বব্যাপী প্রভাবের ক্ষেত্রেও ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণ্য করে বলেই চিন তার কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখতে স্থায়ী মর্যাদা এবং ভেটো ক্ষমতা-সহ একমাত্র এশীয় শক্তি হিসেবে থাকতে চায়। সেই কারণেই ২০১৪ সালে, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরকালে, একটি যৌথ বিবৃতিতে বেজিং নিরাপত্তা পরিষদ-সহ রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের আরও বৃহত্তর ভূমিকা পালনের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করলেও, দিল্লির প্রার্থিপদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল না। এ বারও, বেজিংয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের প্রচেষ্টার উল্লেখ ছিল না। সৌহার্দ বিনিময়ের আড়ালে হয়তো ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষায় ‘পথের কাঁটা’ হয়েই থাকছে চিন।

আরও পড়ুন