ভারতে ইউথানেসিয়া বা নিষ্কৃতি-মৃত্যু বিষয়ক আইনি লড়াই দীর্ঘ দিনের। সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালত পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু কার্যকর করার অনুমতি দিয়েছে হরিশ রানার পরিবারকে। একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জেরে এক যুগেরও বেশি জীবন্মৃত অবস্থায় রয়েছেন হরিশ, আদালত জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়ে মৃত্যুকে এগিয়ে আনার পক্ষে সায় দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে যখন বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও কষ্টকর ও কঠিন হয়ে যায়, তখন মৃত্যুও যে নাগরিক অধিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকার, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষিত জীবনের অধিকারের মধ্যেই পড়ে— এই ব্যাখ্যা ২০১৮ সালেই মেনে নিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে রোগী, পরিবার, চিকিৎসকের সামনে প্রশ্ন ওঠে যে, অসহনীয় অবস্থায় জীবনকে দীর্ঘায়ত করার যন্ত্রণা কতখানি কাম্য— তেমন ক্ষেত্রে পথনির্দেশিকা হতে পারে আদালতের এই সিদ্ধান্ত।
১৯৮৭ সালে বম্বে হাই কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, মৃত্যুর অধিকারও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ২০১১ সালের অরুণা শানবাগ মামলার রায়ে স্বীকৃত নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকারকে আদালতের সাংবিধানিক বেঞ্চ ২০১৮ সালে ‘কমন কজ় বনাম ভারত সরকার’ মামলায় আরও সুসংহত রূপ দেয়। এখানে ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের ‘জীবনের অধিকার’-কে কেবল বেঁচে থাকার অধিকার হিসাবে নয়, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রূপে দেখা হয়েছে। এখানেই ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে দার্শনিক বিতর্কেরও সূত্র মেলে— মানুষ যদি তার জীবনযাত্রা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার আছে। এই যুক্তি আধুনিক মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গেও সাযুজ্যপূর্ণ। প্রত্যক্ষ ইচ্ছামৃত্যু দেশে নিষিদ্ধ। পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে আদালত একগুচ্ছ নির্দেশিকা ও সুরক্ষা ব্যবস্থাও প্রস্তুত করেছে।
আদালত এই বিষয়ে বিচার করতে বারে বারেই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এর সম্প্রসারিত পরিধির দ্বারস্থ হয়েছে। এর মূল কারণ হল, দেশে এই বিষয়ে কোনও সুস্পষ্ট আইন নেই। গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ মঞ্চ সংসদের কোনও কক্ষেই এই বিষয়ে কখনও পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। অথচ, নাগরিকের জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ ও নৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রসঙ্গটিতে আইনপ্রণেতাদেরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। নাগরিকের একান্ত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিসরে বার বার আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে কেন? সংসদের নীরবতার নানা কারণ থাকতেই পারে। ঝুঁকিপূর্ণ, সংবেদনশীল বিষয়; কম মানুষের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা, ভারতের মতো দেশে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, অন্যের উপর নির্ভরশীল মানুষের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের আশঙ্কা। কিন্তু একটি ঋজু আইনি কাঠামো থাকলে তবেই তো সুরক্ষা ব্যবস্থাও পোক্ত থাকবে। তাই সংসদে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট আইন তৈরি প্রয়োজন যেখানে একাধিক চিকিৎসা-পর্যালোচনা, মানসিক নিরীক্ষা, জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা এবং ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বাধ্যতামূলক করা হবে। এমন আইন কখনওই মৃত্যুকে উৎসাহ দেবে না; তবে, অনিবার্য চরম অবস্থার মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি ও মানবিক পরিকাঠামো তৈরি রাখবে।