এখনও দশ বছর বাকি আছে, বা তারও বেশি। কিন্তু এর মধ্যেই জার্মানিতে খুব জল্পনা আর তর্ক চলছে, ২০৩৬-এর অলিম্পিক্স সে দেশে আয়োজন করা উচিত কি না, তা নিয়ে। জার্মানি ২০৩৬, ২০৪০, ২০৪৪ এই তিনটি অলিম্পিক্সের যে কোনওটির ‘আয়োজক দেশ’ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে; প্রসঙ্গত, ২০৩৬-এর অলিম্পিক্স আয়োজনে আগ্রহী ভারতও। অলিম্পিক্স আয়োজন তো গর্বের বিষয়, তা নিয়ে একটি দেশে তর্কের কারণ কী? এখানেই ঘনিয়ে আসছে ইতিহাসের ছায়া— একশো বছর আগের ইতিহাস। অ্যাডলফ হিটলারের শাসনাধীন নাৎসি জার্মানিতে ১৯৩৬-এর বার্লিন দেখেছিল অলিম্পিক্স আয়োজন। জার্মানি তার দায়িত্ব পায় ১৯৩১-এ, দু’বছর পর হিটলার ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির ‘অনুরোধ’-এ নাৎসি সরকার ঘোষণা করেছিল— আসন্ন অলিম্পিক্স সব দেশের সব জাতি বর্ণ গোষ্ঠীর মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তার পরের ইতিহাসও সবার জানা: ১৯৩৫-এ ‘নুরেমবার্গ ল’জ়’ প্রণয়ন করে ইহুদিবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী রাষ্ট্র-বয়ানকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হল, সামরিক ধার-ভার বাড়িয়ে তাকে শক্তিশালী করা হল, সেই আবহেই পরের বছর হল অলিম্পিক্স। জোসেফ গোয়েবলস হিটলারকে বুঝিয়েছিলেন, অলিম্পিক্সের মতো বিরাট পরিসরকে ব্যবহার করে নাৎসি মতাদর্শের পতাকা ওড়ানো সহজ হবে। সেই সময়ও বিপুল অর্থব্যয় হয় অলিম্পিক্স আয়োজনে: স্টেডিয়াম তৈরি, পরিকাঠামো গোছানোর কাজে। এই অলিম্পিক্সেই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জেসি ওয়েন্স-এর চারটি সোনা জয় হিটলার মেনে নিতে পারেননি নিশ্চয়ই, তবে দেশ হিসেবে জার্মানির সর্বাধিক পদক জয় তাঁর আত্মদম্ভের মুকুটে পালক গুঁজেছিল।
তার পর রাইন নদী দিয়ে পরিবর্তনের জল বয়েছে বিস্তর। মাঝে ১৯৭২-এ জার্মানি যে আর একটি অলিম্পিক্স আয়োজন করেছিল, সেটিও বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে— অলিম্পিক্স ভিলেজ-এ সন্ত্রাসী হানায় এগারো জন ইজ়রায়েলি অ্যাথলিটের মৃত্যু। জার্মানি উদ্যোগ করলেই অলিম্পিক্সে নেতিবাচক কিছু না-কিছু হয়, এই (কু)সংস্কারও জার্মানদের ভাবাচ্ছে। সেও যদি সরিয়ে রাখা যায়, সরানো যাচ্ছে না ইতিহাসের ঘনান্ধকার— ঠিক একশো বছর পর ২০৩৬-এ অলিম্পিক্স আয়োজনের আগ্রহ অবধারিত ভাবে মনে পড়াচ্ছে ১৯৩৬-এর নাৎসি জমানার অলিম্পিক্সকে। পরিস্থিতি এমনই, দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বলছেন এই আয়োজন-প্রস্তাব ‘ঐতিহাসিক ভাবে সমস্যাজনক’। ইতিহাসবিদদের একাংশের মত, ২০৩৬-এ সত্যিই জার্মানি অলিম্পিক্স আয়োজন করলে তাকে ‘নাৎসি অলিম্পিক্সের শতবর্ষ’ হিসেবে দেখবেই গোটা বিশ্ব— এই ঝুঁকি কি নেওয়া উচিত হবে? আবার এক প্রাক্তন চ্যান্সেলর বলেছেন তা কেন, জার্মানি যে নিজের অতীত অস্বীকার করেনি কখনও, বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পথ হাঁটছে, এই বার্তাটিই ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অলিম্পিক্স আয়োজনের ফলে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য, বর্তমান ও ভবিষ্যতের লগ্নির পরিবেশটি পরিপুষ্টি পাবে— ধনলক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলে কোন মূর্খ?
এই যে নানা মত ও অমত, এর সব কিছুই ইতিহাস ঘিরে। তা প্রমাণ করে, ইতিহাসকে আসলে ভোলা যায় না। একনায়কতন্ত্রের অমানবিক দর্শন এককালে জার্মানি শুধু বিশ্বাসই করেনি, যাপনও করেছে, এবং পরে তা থেকে ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। নাৎসি অতীত সে অস্বীকার করেনি, তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের বাহ্যজীবন থেকে মুছেও ফেলেনি জোর করে। তা সত্ত্বেও ২০৩৬-এর অলিম্পিক্স-আয়োজন ঘিরে ১৯৩৬-এর ইতিহাস জার্মানদের একটি অংশের পীড়া, অস্বস্তির কারণ হচ্ছে। ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি’ শব্দবন্ধটি বহুপ্রচলিত, কিন্তু তার এমন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া সমাজবাস্তবিক উদাহরণ এই মুহূর্তে আর দ্বিতীয়টি আছে কি? আবার এর পাশাপাশিই মনে রাখা দরকার, এখনকার জার্মানি-সহ ইউরোপের বহু দেশেই রয়েছে নব্য-নাৎসি গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও দল— ২০৩৬-এ যাতে জার্মানি সত্যিই অলিম্পিক্স আয়োজন করতে পারে, সেই লক্ষ্যপূরণে কোমর বাঁধছে তারা। এক দল চাইছে ইতিহাসের ক্ষত খুঁচিয়ে ঘা না করতে, আর এক দল চাইছে সেই ইতিহাসই সামনে রেখে প্রেরণা পেতে। ২০৩৬ অলিম্পিক্সের ভার কোন দেশ পাবে তা জানা তো সময়ের অপেক্ষা, কিন্তু এই সব কিছু থেকে ইতিহাসের শিক্ষাটি গ্রহণীয়। একই ইতিহাস যে একাধারে কতটা অস্বস্তি, কতটা প্ররোচনারও কারণ হতে পারে, এ এখন শুধু জার্মানিতে কেন, কাছে-দূরে সর্বত্রই তো প্রকট।