বাকি বিশ্বের নজর যখন পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে আটকে, তখন ইরান সীমান্তের ও-পারে আর এক সংঘাত চলমান। গত ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করার পর, অতি সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। ‘অপারেশন গাজ়াব লিল হক’-এর অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে হামলা চালানোর সময় পাক বায়ুসেনার আঘাতে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি হাসপাতাল। হামলার জেরে এখনও পর্যন্ত নিহত অন্তত চারশো জন। আহত অন্তত ২৫০ জন। ২০০০টি শয্যার হাসপাতালে হামলার দাবি যদিও অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ। তাদের দাবি, বিমান হামলাগুলো কাবুলে আশ্রয় নেওয়া জঙ্গি গোষ্ঠীদের ব্যবহৃত পরিকাঠামো এবং গোলাবারুদের ডিপোকে লক্ষ্য করে ‘সুনির্দিষ্ট ভাবে’ চালানো হয়েছিল। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের সময় কাবুল বিমানবন্দরে সংঘটিত আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৬৯ জন অসামরিক আফগান নাগরিক এবং ১৩ জন আমেরিকান সেনা নিহত হন। তবে বর্তমান তালিবান সরকারের মতে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডটি তার থেকে বহুগুণে মারাত্মক।
লক্ষণীয়, গত কয়েক বছরে বিশ্বের অনেক প্রধান সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল, বিশেষত গাজ়া, ইউক্রেন এবং সুদানে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও কর্মীদের উপর সামরিক এবং অন্যান্য শত্রুতামূলক হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বস্তুত এ মাসের গোড়াতেই ইরানের মিনাব শহরের মেয়েদের একটি স্কুলে বোমা পড়ে মৃত্যু হয় দেড়শোরও বেশি পড়ুয়ার। অথচ, স্কুল ও হাসপাতালের মতো অসামরিক পরিকাঠামোর সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। চতুর্থ জেনিভা কনভেনশনের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং প্রথম জেনিভা কনভেনশনের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের উপর আক্রমণ নিষিদ্ধ। একই ভাবে, জেনিভা কনভেনশনের ১৯৭৭ সালের অতিরিক্ত প্রোটোকল-১-এর ৮৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে, ইচ্ছাকৃত ভাবে বেসামরিক ব্যক্তি বা বেসামরিক স্থাপনার উপর আক্রমণ চালানো, যার ফলে মৃত্যু বা আঘাত ঘটে, একটি ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসাবে যুদ্ধাপরাধ। এমতাবস্থায়, এই হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আরও গুরুতর লঙ্ঘন।
হামলাকারীরা প্রায়শই ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বা ‘পার্শ্বিক ক্ষতি’র অজুহাত দিয়ে যুক্তি দেখায় যে, হাসপাতাল বা স্কুলটি তাদের উদ্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না অথবা কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সময় ভুলবশত এখানে আঘাত লেগেছিল। অথচ, আফগানিস্তানের কেন্দ্রটির একমাত্র কাজ ছিল মানবিক সেবা— অসুস্থ ও অসহায়দের চিকিৎসা ও রক্ষণাবেক্ষণ। তাই ভুলবশতই হোক বা ইচ্ছাকৃত, এই ধরনের অসামরিক প্রতিষ্ঠানকে সংঘাতে লক্ষ্যবস্তু বানানো অমানবিকই নয়, বর্বরোচিত। ভুললে চলবে না, যদি শক্তিশালী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নাগরিক, হাসপাতাল ও স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু করার নিন্দা, শাস্তি প্রদান বা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়, তবে কিন্তু তারা সর্বার্থে রাষ্ট্রীয় আচরণের একটি নতুন নিম্নগামী মানদণ্ড তৈরি করছে, যেখানে এই ধরনের লঙ্ঘন ক্রমশই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, ক্রমশ আরও বেশি করে নৃশংসতাকে উৎসাহিত করে।