সম্প্রতি আমেরিকায় ট্রাম্প-যুগের নানা অভূতপূর্ব ঘটনার গুরুত্ব এখন দেশবিদেশে সর্বজনের আলোচ্য। তবে কিনা, এই সব ঘটনার প্রকাশ্য রূপের গুরুত্ব যতখানি, প্রচ্ছন্ন বা নিহিত রূপের গুরুত্ব তদপেক্ষা বেশি— সে কথাটি কিন্তু সর্বজনের আলোচ্য হয়ে ওঠে না। প্রসঙ্গত, গত কয়েক দিনে মিনেসোটা রাজ্যের ‘মিনিয়াপোলিস সেন্ট পল’ রাজধানী অঞ্চলে যা ঘটতে দেখা গেল, তা ভাবা যেতে পারে। প্রকাশ্য দিবালোকে, জনাকীর্ণ রাস্তায় ফেডারাল বাহিনী অবতীর্ণ হয়ে একের পর এক মানুষকে বাড়ি থেকে বার করে, বাজার থেকে ধরে নিয়ে, নির্যাতন করল, বন্দি করল, এমনকি সরাসরি গুলিবর্ষণে নিহত করা হল বেশ কয়েক জনকে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্রোধ বা প্রতিরোধে আইসিই বা ‘আইস’-এর কানাকড়িও এসে গেল না। পুলিশের শান্তিরক্ষার প্রয়াস ব্যর্থ হল, ফেডারাল বাহিনী যেমন জনগণকে ছত্রভঙ্গ করতে হিংসার আশ্রয় নিল, তেমনই পুলিশকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে নিষ্ক্রিয় করে দিল। সন্দেহাতীত ভাবে এর মধ্যে একটি বড় বার্তা আছে। সেই বার্তা ফেডারাল বাহিনী বনাম প্রদেশ প্রশাসনের সরাসরি সংঘর্ষের। এবং এর মধ্য দিয়েই সূচিত হচ্ছে এক নতুন বাস্তব: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ‘যুক্তরাষ্ট্রীয়’ পরিচিতির এক গভীর ও ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়াস।
কেবল মিনেসোটা নয়। ইতিমধ্যে ফেডারাল-স্টেট সংঘর্ষের ভয়ানক রূপ দেখা গিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া-সহ অন্যান্য প্রদেশেও। উল্লেখ্য, মার্কিন সংবিধান প্রণেতারা স্পষ্ট ভাবে সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার বনাম রাজ্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন, যার মধ্যে রাজ্যের অধিকার বিশেষ ভাবে বিস্তৃত ও ব্যাপক। রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষেত্রগুলির মধ্যে পড়ে আইনশৃঙ্খলা। সুতরাং এই ভাবে রাজ্য পুলিশকে সম্পূর্ণত অগ্রাহ্য করার অর্থ, স্পষ্টতই সংবিধানের বিরুদ্ধতা। মনে রাখা ভাল, কেবল ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন থেকে মার্কিন প্রদেশগুলিকে রক্ষা করার জন্যই এই যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিটি প্রণীত হয়নি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রদেশভিত্তিক সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক বিভিন্নতা এত বেশি এবং এতটাই প্রয়োজনীয় বলে রাষ্ট্রনির্মাতারা মনে করেছিলেন যে, পরস্পরের মতামত আলাদা রাখার জন্যও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত ভাবে তৈরি হয়েছিল। এত দিনে সেই ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত পড়ছে। এত বড় আঘাত সহ্য করে আমেরিকা আর সত্য অর্থে যুক্তরাষ্ট্র থাকতে পারে কি না, এটাই এখন দেখার।
তবে ট্রাম্পীয় আমেরিকাতে এই ‘পরিবর্তন’ লক্ষণীয় হচ্ছে, এর অর্থ এই নয় যে, এর জন্য কেবল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিই দায়ী। অন্তত তিন দশক ধরে দেখা যাচ্ছে, কী ভাবে বিচারবিভাগের নানা রায় ফেডারাল সিদ্ধান্তকে প্রাদেশিক সিদ্ধান্তের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ৯/১১-পরবর্তী সময়কালে জাতীয় নিরাপত্তার নাম করে বার বার প্রাদেশিক আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আদালত বেশির ভাগ সময়েই ফেডারাল ব্যবস্থারই পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সামরিক বা নিরাপত্তাজনিত বিষয় বলে তখন বিশেষ প্রতিরোধ দানা বাঁধেনি। আজ নাগরিক স্বাধীনতা বা নিরাপত্তার প্রশ্নে যখন ফেডারাল-স্টেট সংঘর্ষ উপস্থিত, তখন তাই প্রতিরোধের কোনও নৈতিক বা রাজনৈতিক পূর্বদৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অর্থ সুস্পষ্ট। নীতি যখন লঙ্ঘিত হতে শুরু করে, তখন প্রথমেই তাতে বাঁধ না দিলে পরে অবাঞ্ছিত প্লাবন রোধ করা অসম্ভব।