Old Age

একা ও অনেক জন

ক্রমেই নির্মিত হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ‘লোনলিনেস ইকনমি’। এই অর্থনীতির মূলে রয়েছে পণ্য ও পরিষেবা ক্রয়-বিক্রয়ের একটি সুনির্দিষ্ট বন্দোবস্ত, যা একাকিত্ব মুছতে বদ্ধপরিকর।

শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ ০৯:২৮

রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে বয়স্ক মানুষদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ কোটি ৭০ লক্ষ। আধুনিক কালে ‘বয়স্ক’ শব্দটিতে ঠিক কোন বয়সিদের বোঝায় তা নিয়ে সামাজিক মতভেদ আছে, প্রযুক্তির দৌলতে জীবনযাত্রার উন্নতি ও বিশেষত চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন এ-যুগে ‘বয়স’কে অতিক্রম করার জাদুকাঠি হয়ে উঠেছে, আর্থ-সামাজিক অবস্থানভেদেও। কিন্তু সে তো শরীরের বয়স, আর মনের? ভারতের বড় নগরগুলিতে তো বটেই, ছোট শহর, মফস্‌সল এমনকি গ্রামগঞ্জেও বিপুলসংখ্যক বয়স্ক মানুষ মানসিক ভাবে ‘একা’, বলছেন সমাজ-মনস্তাত্ত্বিকরা। এটা ঠিক যে একাকিত্ব বোধের সঙ্গে সংখ্যার সম্পর্ক নেই: ঘর-ভরা, বহু সদস্যের পরিবারের মধ্যেও এক জন মানুষ মানসিক ভাবে একা বোধ করতে পারেন। কিন্তু ঘটনা হল, একান্নবর্তী পরিবার ক্রমশ মুছে যাচ্ছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কারণে ঘটছে সন্তানসন্ততির অমোঘ পরিযাণ, এবং দিনশেষে দেখা যাচ্ছে— একা থাকছেন বা থাকতে বাধ্য হচ্ছেন এমন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ভারতে উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। এই একা থাকা শারীরিক-মানসিক উভয়তই; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক একাকিত্বও। গবেষকরা বলছেন ‘সোশ্যাল এজিং’-এর কথা— যে অবস্থায় মানুষ সামাজিক মেলামেশা থেকে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে নেয়, প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকেও বেরোয় না, বেরোলেও পাড়াপড়শির সঙ্গে কথা বলে না, উৎসব-অনুষ্ঠান থেকেও সরিয়ে নেয় নিজেকে। এবং, আরও একা হয়ে যায়। যে মাধ্যমটি নিজেকে ‘সমাজমাধ্যম’ বলে দাবি করে সেও ঠিক কতটা স্বাভাবিক সামাজিকতা জোগাতে পারছে তা তর্কযোগ্য— বহু বয়স্ক মানুষ সমাজমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকছেন, কিন্তু তাতে তাঁদের একাকিত্ব কমছে কি?

এই পরিস্থিতিতে ক্রমেই নির্মিত হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ‘লোনলিনেস ইকনমি’। এই অর্থনীতির মূলে রয়েছে পণ্য ও পরিষেবা ক্রয়-বিক্রয়ের একটি সুনির্দিষ্ট বন্দোবস্ত, যা একাকিত্ব মুছতে বদ্ধপরিকর। একে বিশেষজ্ঞরা ‘গিল্ট ইকনমি’ও বলছেন, কারণ এর মূলে রয়েছে এই অপরাধবোধ: আমি খুব একা, কিন্তু আমার একাকিত্ব বাইরের মানুষের কাছে যেন হাট না হয়ে পড়ে, তা যে কোনও ‘মূল্যে’ লুকোতে হবে। এই অপরাধবোধের একটি সামাজিক কারণও আছে— ভারতীয় সমাজে একাকিত্বকে প্রায়ই ‘বহিরাগত’, ‘পশ্চিমি সমাজের প্রভাব’ ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়; ধরেই নেওয়া হয়— যে ঘন সংবদ্ধ সামাজিকতা ও পারিবারিকতা বরাবর ভারতজীবনের অভিজ্ঞান ছিল, এই একুশ শতকেও তা বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি। অথচ ঘটমান বাস্তব হল: একান্নবর্তী পরিবার, পরিবারের বয়স্ক সদস্যটির দেখাশোনার দায়িত্ব অনেকে মিলে ভাগ করে নেওয়া, সামাজিক মেলামেশা ইত্যাদি আর আগের মতো নেই। পূর্বপ্রজন্মগুলিতে সামাজিক সঙ্গ, সান্নিধ্য, মেলামেশা ছিল স্বতঃসিদ্ধ, কিন্তু এখন সেগুলিই হয়ে উঠেছে পণ্য। একাকিত্ব বদলে দিচ্ছে ভোগ ও উপভোগের চরিত্র: একা বয়স্ক মানুষের যত্ন নেওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পণ্য ও পরিষেবার বিরাট একটি বাস্তুতন্ত্র, উচ্চবিত্তের আবাসনগুলি টোপ দিচ্ছে ‘কম্প্যানিয়নশিপ লাইফস্টাইল’-এর; অর্থের বিনিময়ে ‘ইমোশনাল ওয়েলনেস’ নিশ্চিত হবে, এমন সব বন্দোবস্ত বিজ্ঞাপিত হচ্ছে। যে সন্তান বা প্রিয়জন বয়স্ক মানুষটিকে একা রেখে দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তিনিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে অপরাধবোধের শিকার, এবং সেই কারণেই তিনিও দূর থেকে মানুষটিকে ভাল রাখার চেষ্টা করছেন: অ্যাপ-প্রযুক্তিতে খাবার, উপহার পাঠিয়ে, সিনেমা-নাটকের বা বেড়ানোর টিকিট কেটে দিয়ে। কলকাতার বাড়িতে নজর-ক্যামেরা বসিয়ে একা ও অশক্ত মা-বাবার গতিবিধি লক্ষ রাখছেন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা সন্তান। প্রয়োজনের অভাব মিটছে হয়তো, কিন্তু প্রিয়জনের অভাব?

ভারতের সমস্যা হল, বয়স্ক মানুষের একাকিত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষার মতো জরুরি বিষয়গুলি রাষ্ট্রের কাছে এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, একাকিত্বের সঙ্গে বেশি বয়সের যোগটি আর অবিচ্ছেদ্য নয়। ভারতীয় তরুণ-যুবাদের একটা বড় অংশ সারা দিন কাটান আধুনিকতম প্রযুক্তির সঙ্গে, এবং খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাঁদের অনেকেই একটা গোটা দিনে একটি জীবিত মানুষের সঙ্গে সামনাসামনি কথা প্রায় বলেনই না। ‘প্রজন্মের ব্যবধান’ কথাটি চিরকালীন সত্য, কিন্তু প্রযুক্তি এসে সেই ব্যবধানকে এখন কার্যত অলঙ্ঘ্য করেছে। ফলে, সচেতনতা জরুরি। পারস্পরিক সংযোগ ও সংলাপের সামাজিক অভ্যাসটি যাতে ফেরে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন