India-US Relation

অপমানিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সৌজন্যের পরোয়া করেন না, ফলে তিনি হরহামেশা এমন কথা বলেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে সচরাচর উচ্চারিত হয় না। কিন্তু, সেই অসৌজন্য সরিয়ে রাখলেও কিছু সত্য স্পষ্ট জেগে থাকে।

শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪৫

ভারতকে এক মাসের জন্য রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করার অনুমতি দিয়েছে আমেরিকা— এই বাক্যটি যে কোনও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ভারতীয়রই কানে লাগবে। ভারত কোন দেশের থেকে কোন পণ্য আমদানি করবে, তার জন্য আমেরিকার ‘অনুমতি’ প্রয়োজন হবে কেন? কথাটি মুখ ফস্কে বলা নয়, গত কয়েক দিনে আমেরিকান প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে কথাটির এত বার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যে, একে আমেরিকার কূটনৈতিক অবস্থান হিসাবেই পাঠ করা বিধেয়। অর্থাৎ, অন্তত আমেরিকান প্রশাসনের চোখে ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটির মধ্যে উচ্চাবচতা স্পষ্ট— ভারতকে আমেরিকার অনুমতির অপেক্ষা করতে হবে। মনে রাখা জরুরি যে, রাশিয়ান তেল প্রসঙ্গেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, মোদী রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছেন, কারণ তিনি জানেন যে, ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখা জরুরি। ভারতের সর্বোচ্চ নেতাকে অন্য কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মন জুগিয়ে চলতে হয়, এবং তাঁর মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়, এই কথাটি প্রত্যেক ভারতীয়র জন্য অপমানজনক। ঘটনা হল, নয়াদিল্লি এ সব কথার তেমন প্রতিবাদ করেনি— এবং, সেই নীরবতা ভারতের সম্মানের পক্ষে ইতিবাচক নয়। এরও আগে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুর বন্ধ হওয়ার খবরটি প্রথম ঘোষণা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প— তার পর কত বার তিনি দাবি করেছেন যে, ভারত-পাক যুদ্ধ তিনিই থামিয়েছেন, দু’দেশকেই আর্থিক শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়ে, সে হিসাব রাখা অসম্ভব। সব মিলিয়ে আশঙ্কা হচ্ছে, ভারতের প্রতিরক্ষানীতি, বিদেশনীতি, কূটনীতি এবং বাণিজ্যনীতি বুঝি নয়াদিল্লি থেকে নয়, পরিচালিত হচ্ছে ওয়াশিংটন ডিসি থেকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সৌজন্যের পরোয়া করেন না, ফলে তিনি হরহামেশা এমন কথা বলেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে সচরাচর উচ্চারিত হয় না। কিন্তু, সেই অসৌজন্য সরিয়ে রাখলেও কিছু সত্য স্পষ্ট জেগে থাকে। তার মধ্যে প্রধানতমটি হল, কূটনৈতিক দাঁড়িপাল্লায় আমেরিকার বিপ্রতীপে ভারতের অবস্থানটি সাম্প্রতিক অতীতে এখন দুর্বলতম। এবং, তা ঘটেছে মূলত নয়াদিল্লির ভুলে— স্পষ্ট করে বললে, ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের উৎসাহে। আমেরিকার কাছে ভারতের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতখানি, আজকের বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে তা নির্ভর করে মূলত বেজিংয়ের প্রতি দুই দেশের তুলনামূলক অবস্থানের উপরে। ট্রাম্প পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে চিনের সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতা থেকে অংশত সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কোয়াড-এর গুরুত্ব কমেছে; আমেরিকার কাছে ভারতের অবস্থানগত গুরুত্বও কমেছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পই ইউএস প্যাসিফিক কম্যান্ড-এর নাম পাল্টে ইউএস-ইন্ডিয়া প্যাসিফিক কম্যান্ড করেছিলেন— শাসনের দ্বিতীয় দফায় তিনিই ভারতের সেই গুরুত্ব কেড়ে নিলেন।

আমেরিকাকে চাপে রাখার জন্য দিল্লির কর্তব্য ছিল বেজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। ব্রিকস নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তি প্রশ্নাতীত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনৈতিক জোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের গুরুত্ব কমাতে সক্ষম— যা হতে পারত ভারতের তুরুপের তাস। কিন্তু, সে পথে হাঁটতে হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তো বটেই, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক আধিপত্যের কথাকে নিজের নীতিনির্ধারণের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে স্বীকার করতে হত। কিন্তু, এক দিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ছাতির মাপের মর্যাদা রক্ষা’, আর অন্য দিকে আমেরিকার প্রতি প্রায়-ঔপনিবেশিক এক আকর্ষণ, দুইয়ে মিলে দিল্লি ঠিক উল্টো পথে হাঁটল। তার উপরে ২০২৫-এ বিভিন্ন দফায় আমেরিকাকে তাদের প্রত্যাশার অতীত বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল। ফলে, এখন মুহূর্তে আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষিতে ভারতের হাতে কার্যত কোনও অস্ত্র নেই।

আরও পড়ুন