Children reading habits

গল্পের বইয়ে আর টান নেই শিশুদের? কেউ বলে মুঠোফোনই শত্রু, কারও মনে হয় বড়রাই পথ ভোলাচ্ছেন

অর্ণব, মেঘা, অঙ্কিতা, শুভ্রজিতদের বয়স ৮ থেকে ১৩। কেউ পড়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে, কেউ আবার বাংলা মাধ্যমে। ওদের অনেকের গল্পের বই পছন্দ হলেও আকর্ষণ বেশি মুঠোফোনের প্রতিই। এক বার ফোন খুললে আর চোখ সরে না সেখান থেকে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৬
গল্পের বই পড়ার আগ্রহ কি কমছে?

গল্পের বই পড়ার আগ্রহ কি কমছে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

অর্ণবের পছন্দ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। মেঘার আবার লীলা মজুমদার। বাড়ির কেউ বইয়ের মুখ না দেখলেও ষষ্ঠ শ্রেণির অঙ্কিতার অবসর কাটে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে। তবে তারা হাতে গোনাই।

Advertisement

পাল্লা ভারী শুভ্রজিতের দিকে। সে গল্পের বই পড়তে মোটেও রাজি নয়। তার সাফ কথা, “স্কুলের বই পড়েই শেষ করতে পারছি না! আবার গল্পের বই পড়লে খেলব কখন? ফোনে রিলই বা দেখব কোন সময়ে?” শুভ্রজিতের বেশির ভাগ বন্ধুও মনে করে এমনই। অর্ণব, মেঘা, অঙ্কিতা, শুভ্রজিতদের বয়স ৮ থেকে ১৩। কেউ পড়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে, কেউ আবার বাংলা মাধ্যমে। ওদের অনেকের গল্পের বই পছন্দ হলেও আকর্ষণ বেশি মুঠোফোনের প্রতিই। এক বার ফোন খুললে আর চোখ সরে না সেখান থেকে।

তবে কি ছোটদের মধ্যে গল্পের বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে? মোবাইল ফোনের প্রতি টানই কি এর কারণ?

শিশুদের জন্যই বই প্রকাশ করেন অন্তরা দত্ত। সেটাই তাঁর তিন পুরুষের ব্যবসা। অন্তরা বলেন, “শিশুদের ভাল গল্পের বই দিলেই তারা পড়বে। সেটা খুব ছোট থেকে অভ্যাস করানো প্রয়োজন।” তিনি মনে করেন, একেবারে ছোটবেলায় কী ধরনের বই শিশুদের দেওয়া হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় খুব ভয়ের বা কষ্টের গল্পের বই হাতে পড়লে হয়তো প্রত্যাখ্যানের ভাব তৈরি হতে পারে। আর সে দিকে সচেতন ভাবে নজর দেওয়া দরকার বড়দের বলে মনে করেন অনেকেই।

গল্পের বিষয় কী, সে দিক নিয়ে ভাবনা জোগাচ্ছেন আর এক প্রকাশক। গত চার বছর ধরে ছোটদের বইপ্রকাশ করছেন সৌমেন দাসগুপ্ত। তিনিও প্রায় একই মনোভাব প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, “ছোটদের কি আদৌ ছোটদেরই বই দেওয়া হচ্ছে? সেগুলি কি সত্যি তাদের জন্যই লেখা? ছোটদের ভাষা বুঝে তাদের মতো গল্পের বই দিলে ছোটরা ঠিক পড়বে।” সৌমেন মনে করেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লেখার বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আধুনিক প্রজন্মের শিশুরা অনেক বেশি সচেতন ও বাস্তববোধ সম্পন্ন। সে ক্ষেত্রে রূপকথার চাহিদা কমে যাচ্ছে। কিন্তু কল্পবিজ্ঞানে আগ্রহ কমছে না। ছোটদের কথা ভেবে সাহিত্যিকদেরও রচনায় পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তবে কি ছোটদের আর পুরনো সব গল্পে মন নেই? শুধু হাতেগোনা কেউ কেউ রূপকথার গল্প পছন্দ করে? নাকি কোনও ছোটগল্প, উপন্যাসেই আর টান নেই তাদের? স্কুলশিক্ষক থেকে বইয়ের প্রকাশক কিংবা অভিভাবক, নানা জনের সঙ্গে কথা বলেই মিলছে এক ধরনের উত্তর। তাঁদের বক্তব্য, টানা অনেক ক্ষণ যাতে মন দিতে হয়, তেমন সব কিছুতেই আকর্ষণ কমছে ছোটদের। নাচ-গান, সিনেমা থেকে ক্রিকেট— হাতে বেশি সময় নেই কোনও কিছুর জন্যই। স্ক্রোলিংয়ের যুগে তাই উপন্যাস পিছিয়ে পড়ছে। স্কুল, বাড়ির পড়াশোনার পর প্রতিযোগিতামূলক নানা পরীক্ষার প্রস্তুতিতেই জর্জরিত ছোটরা। এর পর আবার বড় কোনও গল্প পড়ার ধৈর্য আর থাকছে না। বরং মনোরঞ্জনের জন্য বেছে নিচ্ছে সেই মুঠোফোন।

অবসরপ্রাপ্ত বাংলার শিক্ষিকা সুদেষ্ণা মৈত্র এখন সময় কাটান ছোটদের নিয়ে। তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, উপন্যাসের থেকে রকমারি ছবি দিয়ে সাজানো ছোট ছোট গল্পই বেশি নজর কাড়ে খুদেদের। তিনি মনে করেন, এটাই প্রাথমিক ধাপ হওয়া উচিত। বড়রা যদি একটু সচেতন ভাবে ছোটদের হাতে বই ধরান, তা হলে তারা পড়তে ভালবাসবে। তার পর ধীরে ধীরে গল্পের বইয়ের প্রতি ভাল লাগা তৈরি হলে, এক সময়ে তারা নিজেরাই উপন্যাস পড়তে শুরু করে।

তবু যারা পড়তে চায়, তারা কোন ভাষার বই বেশি পড়ে? বাংলা না কি ইংরেজি?

বিক্রির দিক থেকে বাংলা গল্পের বই যে পিছিয়ে, এমনটা নয়। ছোট এবং বড়দের বই নিয়ে কাজ করা প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার শুভঙ্কর দে অবশ্য মনে করেন, বাংলা গল্পের বইয়ের ধরন পরিবর্তন করা খুব প্রয়োজন। ইংরেজি গল্পের বইয়ের ক্ষেত্রে নতুন ভাবে সংস্করণ করা হয়। সেখানে বাংলা কোনও গল্পের বই সেই একই ছবি ব্যবহার করে প্রকাশ হয়ে আসছে। শিশুদের কাছে শুরুটা চমকপ্রদ করা খুব প্রয়োজন বলেই মনে করছেন শুভঙ্কর।

পরিবারের বিশেষ দায়িত্ব আছে ছোটদের জন্য বই পড়ার পরিবেশ তৈরির জন্য, সে প্রসঙ্গও তুলছেন কেউ কেউ। যেমন শিক্ষিকা এবং সাহিত্যিক মহুয়া দাশগুপ্ত মনে করেন, ছোটদের মধ্যে যে কোনও আগ্রহ গড়ে তোলার নেপথ্যে পরিবারের বড় ভূমিকা থাকে। এক সময়ে বড়দের কাছে গল্প শুনেই সময় কাটত তাদের। সেই প্রবণতা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। মহুয়া বলেন, “আগে ঠাকুরমা, ঠাকুরদা-সহ একটি যৌথ পরিবারে বড় হত খুদেরা। রূপকথার সঙ্গে আরও নানা গল্প শুধু শুনে শুনেই ঠোটস্থ করে নিতে পারত। এখন বাড়িতে শুধু বাবা-মা। বড় হওয়া হয়তো গৃহকর্ম সহায়িকার কাছে। তাই বাড়ির বড়দের কাছে বেশি গল্প শোনার সুযোগ নেই। সারা দিন একা একা কাটাতে গিয়ে কখন যে তাদের সঙ্গী হয়ে উঠছে মুঠোফোনে ধরা পড়া বৃহৎ জগৎ, তা হয়তো কেউই খেয়াল করছেন না।”

তবে কি মুঠোফোনেই যাবতীয় বিপত্তি?

মহুয়া, সৌমেন, সুদেষ্ণারা অনেকাংশেই একমত। তাঁরা মনে করেন, কয়েক মাসের শিশুকেও খাওয়ানো হয় মোবাইল দেখিয়ে। সেই থেকে টান জন্মে যাচ্ছে। সেখানে কল্পনার কোনও পরিসর থাকছে না। ফলে ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসছে মুঠোফোনের নেশা। পরে একটু বড় হলে সেই শিশুকে বই কিনে দিলেও তার আর মন বসে না সে সবে।

অথচ, বইয়ের হাত ধরে গড়ে ওঠে মূল্যবোধ, তৈরি হয় ভাষার প্রতি দখল, শব্দের সঙ্গে আত্মীয়তা, সে কথা মনে করেন নানা স্কুলের শিক্ষকেরা। অভিভাবকেরা অবশ্য আবার অনেকে মনে করেন, স্কুলের গ্রন্থাগারগুলির গুরুত্বও অপরিসীম ছোটদের মধ্যে বইয়ের প্রতি টান তৈরি করার ক্ষেত্রে। যদি ভাল গ্রন্থাগার থাকে এবং সেখানে পড়ুয়াদের নিয়ে গিয়ে নতুন নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করান শিক্ষকেরা, তা হলে অর্ণব, মেঘা, অঙ্কিতার মতো আরও বহু স্কুলপড়ুয়া নানা রকম বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে। ধীরে ধীরে আবার ফিরবে দেশ-বিদেশের গল্পের বই পড়ার প্রতি টান।

Advertisement
আরও পড়ুন