Invention

তাপ ধরে রাখবে স্ফটিক, তৈরি হবে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ! উষ্ণ পৃথিবীতে আশার আলো বাঙালির আবিষ্কার

বিজ্ঞানের সূত্র বলছে, তাপ পরিববাহিত হয় কণার বিচ্ছুরণে। কিন্তু এই গবেষণায় যে ‘থ্যালিয়াম সিলভার আয়োডাইট’ আবিষ্কার করা গিয়েছে, তা তাপ পরিবহণ করছে তরঙ্গ আকারে। যে কারণে তাপকে পদার্থের মধ্যেই আটকে রাখা গিয়েছে

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ ১৭:২২

গ্রাফিক : আনন্দবাজার ডট কম

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রকৃতির বিড়ম্বনা। সে বিড়ম্বনার সূচনা যে শিল্প বিপ্লবের পর, তা হয়তো নয়। বরং যে দিন আগুন জ্বালতে শিখেছিল মানুষ, সে দিনই শুরু হয়েছিল ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া। অনেকেই মনে করেন এমন। দায়ী করা হয় বিজ্ঞানকে। আবার, সেখান থেকেই ফেরার পথও দেখায় বিজ্ঞান।

Advertisement

গত কয়েক দশকে গোটা বিশ্বের কাছে সব থেকে বড় বিপদ হয়ে উঠেছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। পৃথিবীকে বাসোপযোগী করতে করতে মানুষ আদতে ধ্বংসের পথে হেঁটেছে। আধুনিক নানা যন্ত্রপাতি— গাড়ি থেকে রেফ্রিজারেটর বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র, সবই শক্তি উৎপাদনের বিনিময়ে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিচ্ছে তাপ। বাড়ছে উষ্ণায়ন। এমনকি চায়ের দোকানে বা বড় বড় রেস্তোরাঁর হেঁসেল থেকেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে।

ঠিক সেই সময় বিজ্ঞানই চাইছে কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতে। এক দল বাঙালি বিজ্ঞানী দাবি করছেন, তাঁরা আবিষ্কার করেছেন ‘থ্যালিয়াম সিলভার আয়োডাইট’ নামের স্ফটিক। যা, জ্বলন্ত উনুনের পাশে বস্তুটিকে বসিয়ে রাখলে আগুন থেকে উৎপন্ন উত্তাপকে ধরে রাখবে। তার পর সেই তাপকে পরিবর্তন করা যাবে ‘থার্মো ইলেকট্রিক’.বা ‘সবুজ বিদ্যুৎ’-এ। গাড়িতে পেট্রোল পুড়লেও যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা থেকেও এই পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ তৈরি করা।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ,মেদিনীপুর কলেজ এবং হাবড়ার শ্রী চৈতন্য কলেজের প্রাক্তনীদের হাত ধরেই হয়তো বিজ্ঞানের এক নতুন সূচনা হতে পারে। সম্প্রতি আমেরিকার ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স’-এ (পিএনএএস) প্রকাশিত হয়েছেযাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রাক্তনী কণিষ্ক বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন গবেষণার ফলাফল।

কণিষ্ক বর্তমানে বেঙ্গালুরুর জওহরলাল নেহরু সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড সায়েন্টিফিক রিসার্চ (JNCASR)-এর শিক্ষক। তাঁরই সঙ্গে রয়েছেন এই গবেষণার প্রথম লেখক ঋদ্ধিময় পাঠক। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা শুরু করে তিনি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক হন। যৌথ প্রথম লেখক সায়ন পাল মেদিনীপুর কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক। ওই দলে রয়েছেন হাবড়ার শ্রীচৈতন্য কলেজের প্রাক্তনী শুভ বিশ্বাসও। ওই দলে রয়েছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী থিওরি কোলাবোরেটর কণিষ্কের সহকর্মী স্বপন পতিও

ঋদ্ধিময় পাঠক (উপরের বাঁ দিকে),  সায়ন পাল (উপরের মাঝখানে),  শুভ বিশ্বাস (উপরের ডানদিকে) ,স্বপন পতি (নীচের বাঁ দিকে) এবং কনিষ্ক বিশ্বাস (নীচের ডানদিকে)

ঋদ্ধিময় পাঠক (উপরের বাঁ দিকে), সায়ন পাল (উপরের মাঝখানে), শুভ বিশ্বাস (উপরের ডানদিকে) ,স্বপন পতি (নীচের বাঁ দিকে) এবং কনিষ্ক বিশ্বাস (নীচের ডানদিকে)

বিজ্ঞানের সূত্র বলছে, তাপ পরিববাহিত হয় কণার বিচ্ছুরণে। কিন্তু এই গবেষণায় যে ‘থ্যালিয়াম সিলভার আয়োডাইট’ আবিষ্কার করা গিয়েছে, তা তাপ পরিবহণ করছে তরঙ্গ আকারে। যে কারণে তাপকে পদার্থের মধ্যেই আটকে রাখা গিয়েছে বলে জানান কণিষ্ক। তাঁর কথায়, “এই তাপ থেকে যে বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে সেটা হবে তা পরিবেশবান্ধব। অর্থাৎ সেখানে কোনও কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা কার্বন-মনোক্সাইড তৈরি হবে না।”

তিনি জানান, কোনও পদার্থ পুড়িয়ে বা অন্য মাধ্যমে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তার মাত্র ৩৫ শতাংশই ব্যবহার করা যায়। বাকি ৬৫ শতাংশ তাপের আকারে মিশে যায় পরিবেশে। ফলে বাড়ে ‘গ্লোবাল ওর্য়ামিং’। গবেষকের দাবি, নতুন আবিষ্কৃত পদার্থটি ওই বাড়তি ৬৫ শতাংশের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ উত্তাপ ধরে রাখতে পারে নিজের মধ্যে। পরবর্তীতে তাকে ‘গ্রিন ইলেকট্রিসিটি’তে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এর ফলে পরিবেশের উপরেও চাপ কমবে বলে আশা তাঁর।

কী ভাবে ব্যবহার করা যাবে এই পদার্থটি?

তিনি জানান, এই পদার্থটিকে কোনও বৈদ্যুতিন যন্ত্রে স্থাপন করে সহজেই ব্যবহার করা যায়। গাড়ির বা বাতানুকুল যন্ত্রের যে অংশ তাপ নির্গমন করে, সেখানে নবাবিষ্কৃত যন্ত্রটি প্রতিস্থাপন করলেই তার মধ্যে থাকা ‘থ্যালিয়াম সিলভার আয়োডাইট’ স্ফটিকটি উত্তাপের খানিকটা ধরে রাখতে পারবে।

কণিষ্ক মনে করেন, ছোট্ট কোনও যন্ত্রের মধ্যে এই স্ফটিকের ব্যবহার হলে, ঘরে ঘরে রচিত হতে পারে যুগ বদলের কাহিনি।

Advertisement
আরও পড়ুন