ম্যাকাক প্রজাতির একটি ছোট্ট বাঁদর, মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত। তাই সে ঘুরে বেড়ায় মানুষের কোলে কোলে। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে এই ভিডিয়ো দেখেছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। ছোট্ট বাঁদরের নিষ্পাপ মুখ আর তার প্রতি মানুষের যত্ন মন কেড়েছে সকলের। তবে শুধু জাপানের ইচিকাওয়া শহরের ওই চিড়িয়াখানাই নয়, বন্যপ্রাণীদের পরম মমতায় যত্ন করেন সেখানে নিযুক্ত পশুশালারক্ষক বা জ়ু-কিপাররা। এমন বাঘ-সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও তাঁদের গড়ে ওঠে বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
চাইলে এই কাজকে বেছে নেওয়া যেতে পারে পেশা হিসাবে।
পশুশালারক্ষকের কাজ কী?
পশুপাখিকে নিয়মিত খাওয়ানো, স্নান করানো, শারীরিক কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না দেখা, খাঁচা পরিষ্কার রাখার মতো দায়িত্ব থাকে জ়ু কিপারদের উপর। পশুপাখিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাঁচার ভিতরে থাকা প্রাণীরা ঠিক মতো খাবার খাচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। তাদের পরিচর্যার দায়িত্বও থাকে। নতুন আসা প্রাণীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে অর্জন করে নিতে হয়।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
কারা হতে পারেন জ়ু-কিপার?
বন্যপ্রাণীর সঙ্গে কাজ করার জন্য জীবজগৎ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এ জন্য প্রাণিবিদ্যা, জীববিদ্যা, অ্যানিম্যাল সায়েন্স, ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজির মতো বিষয়ের যে কোনও একটিতে উচ্চশিক্ষা থাকা প্রয়োজন।
উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা সমতুল পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়ে উত্তীর্ণ হওয়া পর স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পড়া যায় ওই বিষয়ে। এর পর বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর শারীরিক গঠন, তাদের আচরণ, খাদ্যাভাস, প্রজননের কৌশল সম্পর্কে জানা যায়।
কোথায় পড়ানো হয়?
এ দেশে স্নাতক স্তরে প্রাণিবিদ্যা, জীববিদ্যা, অ্যানিমেল সায়েন্স, ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজি বিষয়গুলি যে সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়—
স্নাতকোত্তর স্তরে প্রাণিবিদ্যা এবং ওয়াইল্ডলাইফ সায়েন্স বিষয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়াতে পড়ানো হয়ে থাকে। ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে উল্লিখিত বিষয়ে পিএইচডি করার সুযোগও পাওয়া যায়।
জ়ু ম্যানেজমেন্ট-এর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন:
পরিবেশ অনুযায়ী বন্যপ্রাণীদের আচার আচরণ পরিবর্তন হয়ে থাকে। চিড়িয়াখানার মতো জায়গায় কাজ করার জন্য তাই প্রথাগত পড়াশোনা সম্পূর্ণ করে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞেরা জ়ু ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত কৌশল হাতেকলমে শেখান। এ ছাড়াও পশু পাখিদের ডায়েট কেমন হওয়া দরকার, বিভিন্ন বয়সের প্রাণীদের কী ভাবে যত্ন করতে হবে, প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে— সেই সব কিছুও ওই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়ে থাকে।
প্রাণীর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক জু কিপারদের। ছবি: সংগৃহীত।
এই কাজে শারীরিক পরিশ্রম অনেক বেশি করতে হয়। কাজের জন্য অন্যত্র গিয়ে থাকতেও হয়। তাই এ ক্ষেত্রে পশুপাখিদের ভালবাসাটাই যথেষ্ট নয়। অনেক সময়ই বন্যপ্রাণীরা হিংস্র হয়ে ওঠে। এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তাদের দেখভাল করতে হয়। ফলে মানসিক দৃঢ়তাও প্রয়োজন।
কোথায় প্রশিক্ষণ হয়?
এ দেশে সেন্ট্রাল জ়ু অথরিটি, দিল্লির ন্যাশনাল জ়ুলজিক্যাল পার্ক, হায়দরাবাদের নেহরু জ়ুলজিক্যাল পার্কে ওই সব বিষয়গুলি হাতেকলমে শেখানো হয়ে থাকে।
কাজের সুযোগ কী ভাবে পাওয়া যায়?
মূলত অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার উপর ভিত্তি করেই বন্যপ্রাণীদের দেখভালের কাজে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। তাই ডিগ্রি অর্জনের পর বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অধীনে বন্যপ্রাণ পুনর্বাসন কেন্দ্রে কিংবা পশু চিকিৎসা কেন্দ্রে চুক্তিভিত্তিক কাজ শুরু করা যেতে পারে। সেখানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় ইন্টার্ন কিংবা স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে যোগদানের সুযোগ মিলবে। এ ছাড়াও সরকারি চিড়িয়াখানাতেও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে আগ্রহীদের কাজ শিখে চাকরি পেতে পারেন।
বেতন:
জ়ু-কিপার হিসাবে নিযুক্তেরা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। পরবর্তীতে ওই বেতনক্রম ৪০,০০০-৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।