— প্রতীকী চিত্র।
৯৯ শতাংশের উপর নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করছে বর্তমান প্রজন্মের পড়ুয়ারা। শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে মাধ্যমিক ২০২৬-এর ফলাফল। প্রথম স্থানাধিকারী অভিরূপ ভদ্র পেয়েছে ৬৯৮ নম্বর, অর্থাৎ ৯৯.৭১ শতাংশ। গত কয়েক বছরে সর্বোচ্চ নম্বরের হার বেড়েছে। কিন্তু সার্বিক ছবিটা এত ঝকঝকে নয়।
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের হিসাব বলছে, এ বারের মাধ্যমিকে ৯০ শতাংশের উপর নম্বর পেয়েছে মাত্র ১.৪৬ শতাংশ। ৫৫ শতাংশ পরীক্ষার্থীর নম্বরই ৫০ শতাংশের নীচে।
শুধু তা-ই নয়, দেখা যাচ্ছে গণিতে ৯০ শতাংশের উপর নম্বর পাওয়ার হার খুবই কম। অর্থাৎ, নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ছে নির্ভুল গণিতের বিচারে।
আর এই প্রবণতাই চিন্তায় ফেলছে শিক্ষামহলকে। শিক্ষকদের একাংশের দাবি, নতুন প্রজন্মের পড়ুয়াদের মধ্যে নিবিড়পাঠের প্রতি আগ্রহ কমছে। বরং তারা চাইছে কোনও রকমে পাশ করে বৃত্তিমূলক পঠনপাঠনে ঝুঁকতে, যাতে সহজে চাকরি পাওয়া যায়। তাই মাধ্যমিক পরীক্ষাটি কোনও রকমে পাশ করে গেলেই তারা খুশি।
এ বছর মাধ্যমিক পাশ করেছে ৭ লক্ষ ৮২ হাজার ৯৭০ পরীক্ষার্থী। অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থীই ১০০-র মধ্যে ৫০-এর কম নম্বর পেয়েছে। খাতা দেখার সময়ই এই প্রবণতা লক্ষ করেছিলেন পরীক্ষকেরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতার এক প্রধান পরীক্ষক জানান, “আমাদের উপর মৌখিক নির্দেশ ছিল, পাশ নম্বরের কাছাকাছি নম্বর থাকলেই বাড়তি কিছু নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ, অকৃতকার্যের সংখ্যা কমাতে হবে। কিন্তু আমরা এমন খাতাও পেয়েছি অসংখ্য যেখানে নম্বর আটকে গিয়েছে ৫-এ।” ওই শিক্ষকের দাবি, ইতিহাস বা ভূগোলের মতো বিষয়ে ব্যাখ্যামূলক বড় প্রশ্নের উত্তর অনেকেই দিতে পারছে না। ইংরেজি ব্যকরণের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। তবে সব থেকে দুরবস্থা সম্ভবত গণিতেই। একের পর এক খাতায় শূন্য দিতে হয়েছে বলে আক্ষেপ করেছেন অনেক শিক্ষকই।
ফলপ্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, কোনও বিষয়ে ৯০-এর উপর নম্বর পেয়েছে এমন পড়ুয়ার সংখ্যা অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম। ৯০-এর উপর নম্বর প্রাপ্তির দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গণিত, ভৌতবিজ্ঞান এবং ইংরেজির। তুলনায় ভূগোল ও জীবনবিজ্ঞানে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী ৯০-এর উপর নম্বর পেয়েছে।
মধ্য শিক্ষা পর্ষদ সূত্রে খবর,
এএ গ্রেড অর্থাৎ, ৯০-এর উপর নম্বর পেয়েছে ১৩,৮৯৫ জন পড়ুয়া (১.৪৬ শতাংশ)।
এ প্লাস অর্থাৎ, ৮০-৮৯ নম্বর পেয়েছে ২৬৮২৩ জন (২.৮১শতাংশ)।
এ অর্থাৎ, ৬০-৭৯ নম্বর পেয়েছে ৯১,৯৭৯ জন (৯.৬৪)।
বি প্লাস অর্থাৎ, ৪৫-৫৯ নম্বর পেয়েছে ১,৪৭,০৭৯ জন (১৫.৪২)।
বি অর্থাৎ, ৩৫-৪৪ নম্বর পেয়েছে ১,৯৭,২৭৬ জন (২০.৬৮শতাংশ)।
সি অর্থাৎ, ২৫-৩৪ নম্বর পেয়েছে ৩,২৮,৯৬৩ জন (৩৪.৪৯ শতাংশ)। দেখা যাচ্ছে, ২৫ থেকে ৩৪ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সব থেকে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী।
কিন্তু কেন এমন অবস্থা?
কলকাতার একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থার দিকেই আঙুল তুলেছেন। তাঁর দাবি, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দেওয়ায় পড়ুয়াদেরই ক্ষতি হয়েছে। এতে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলির মেধামান ক্রমশ কমছে। আর এক স্কুলশিক্ষক অভিযোগ করেছেন, পড়ুয়ারা এখন স্কুলে আসতেই চায় না। ফলে পঠনপাঠনে ভাটা পড়ছে।
শিক্ষক নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘তৃণমূল সরকারের আমলে পড়াশোনা ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছিল নানা প্রকল্প। সেই সব প্রকল্পের সুবিধা নিতেই পড়ুয়ারা শুধু নাম নথিবদ্ধ করত। স্কুলে আসত না। ফলাফলের সার্বিক অবনমনের জন্য দায়ী বিগত সরকার। আগামী দিনেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই ধারা চলতে থাকবে।’’ অন্য আর এক শিক্ষক নেতা অনিমেষ হালদার অবশ্য দাবি করেন পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার ফলেও ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা। তিনি বলেন, ‘‘বহুদিন স্কুলগুলিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। এর ফলে সার্বিক ভাবে ছাত্রছাত্রীর মানের এই অবনমন হচ্ছে।’’