শ্যামনগরে মৃত আইএসএফ কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে আরাবুল। — নিজস্ব চিত্র।
দলের জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলের সঙ্গে ছিলেন আরাবুল ইসলাম। তবে বার বারই সেই সম্পর্কে টানাপড়েনেও কম যায়নি।
সিপিএমের ভরা বাজারে ২০০৬ সালে ভাঙড়ে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হয়ে বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। তারপরে নানা বিতর্কে জড়ান। ভাঙড় কলেজে শিক্ষিকাকে জগ ছুড়ে মারা, কলকাতার লেদার কমপ্লেক্স থানার এক পুলিশ অফিসারের মাথায় বাঁশের বাড়ি মারা-সহ নানা বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তাঁকে।
২০১১ সালে তৃণমূলের টিকিটের ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রে হেরে যান। ২০১৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে পঞ্চায়েত সমিতির টিকিটে জয়ী হয়ে ভাঙড় ২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হন। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে দল তাঁকে টিকিট না দেওয়ায় তিনি দলীয় প্রার্থী রেজাউল করিমের বিরোধিতা করে দলকে হারিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে দল ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক সওকাত মোল্লাকে ভাঙড়ের পর্যবেক্ষক করে দায়িত্ব দেয়। ওই পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন পর্ব থেকে শুরু করে গণনার দিন পর্যন্ত তৃণমূল-আইএসএফের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। যদিও সওকাতের হাত ধরেই আরাবুল ভাঙড় ২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হন।
তারপর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে সওকাতের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। আস্তে আস্তে দলে কোণঠাসা হতে থাকেন আরাবুল। আইএসএফ কর্মী মহিউদ্দিন মোল্লা খুনের ঘটনায় তাঁর নাম জড়ায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের গ্রেফতার হয়ে বেশ কয়েক মাস জেল খাটেন আরাবুল।
তাঁকে ছাড়াই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে সওকাতের নেতৃত্বে ভাঙড় থেকে তৃণমূল আইএসএফের থেকে প্রায় ৪২ হাজারের বেশি ভোট পায়।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আরাবুলকে দল নিলম্বিত করে দেয়। তারপর থেকে তিনি এত দিন চুপচাপ ছিলেন। আরাবুল দল ছাড়ার কথা ঘোষণা করলেও তাঁর পুত্র হাকিমুল ইসলাম দলের সঙ্গেই আছেন। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সদস্য। আরাবুলের আর এক সঙ্গী কাইজ়ার আহমেদও দীর্ঘদিন ধরে দলে কোণঠাসা। কাইজ়ারও ইদানীং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। সওকাতের বিরুদ্ধেও তিনি সরব।
আরাবুল দল ছাড়লেও কাইজ়ারও কি একই পথে হাঁটবেন?
তিনি বলেন, ‘‘দলে থেকে কোনও সম্মান পাচ্ছি না। বরং হুমকি পেতে হচ্ছে। দলকে বহু বার জানিয়েছি, কিন্তু কাজ হয়নি। তবে এখনও দল ছাড়ার কথা ভাবিনি। দল যদি কোনও সিদ্ধান্ত না নেয়, তা হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’’
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া মেলেনি সওকাতের। তৃণমূলের জেলা সংখ্যালঘু সেলের সভাপতি তথা জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে দলবিরোধী কাজ করছিলেন আরাবুল। সে কারণে তাঁকে আগেই দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’’
গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে সমস্ত আইএসএফ কর্মীরা খুন হয়েছিলেন, এ দিন শ্যামনগরে এক আইএসএফ নেতার বাড়িতে গিয়ে সেই পরিবারের লোকজনর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন আরাবুল। যে মহিউদ্দিন মোল্লার খুনের ঘটনায় আরাবুলকে জেল খাটতে হয়েছিল, তাঁর পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন। আরাবুল পরে বলেন, ‘‘সে দিন যখন বোমা-গুলি চলেছিল, তখন আমি ব্লক অফিসের মধ্যে কার্যত বন্দি ছিলাম। এক নেতার নির্দেশে বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে হামলা চালানো হয়েছিল। মৃত আইএসএফ কর্মীদের পরিবারকে আমার সম্পর্কে ভুল বোঝানো হয়েছিল। তাই তাঁদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানালাম।’’