West Bengal Assembly Election 2026

প্রায় ৯৩ শতাংশ মহিলা প্রথম দফায় ভোট দিয়েছেন! ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ না ‘রাতদখল’? অঙ্ক কষা চলছে তৃণমূলের অন্দরে

সর্বশেষ বড় ভোট ২০২৪ সালের লোকসভা। সেই ভোটের ফলাফল বলেছিল, মমতাতেই আস্থা রেখেছে রাজ্যের মহিলা ভোটের সর্বাধিক অংশ। আবার এ-ও বাস্তব যে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের দেড় মাসের মধ্যেই আরজি কর নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন মহিলারা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:২৭
Calculations are going on in the TMC over the record turnout of women in the first phase of polling in West Bengal

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দাবি আছে। প্রত্যাশিত ভাবে আছে পাল্টা দাবিও। কিন্তু সে সব প্রকাশ্যে। ভিতরে ভিতরে বিজেপি এবং তৃণমূল যুযুধান দুই শিবিরে প্রথম দফার ভোটের হিসাব কষা জারি রয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য ‘সূচক’ হয়ে উঠেছে মহিলাদের ভোটদানের রেকর্ড। সেই সূত্রেই রয়েছে প্রশ্ন, এত মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে বুথে দাঁড়ালেন, ভোট দিলেন। এই ভোট কি সব লক্ষ্মীর ভান্ডারের? না কি এই ভোট ‘রাতদখলের’? অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার? ভোটের মাধ্যমে রাত দখলের ভোট?

Advertisement

গত ১৭ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব ভোটেই মহিলা সমর্থনের সিংহভাগ পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটা সময়ে বিহারে লালুপ্রসাদ যাদবের দল আরজেডির জয়ের নেপথ্যের কারণ বোঝাতে ‘এমএমওয়াই’ সমীকরণের কথা বলা হত। অর্থাৎ, মুসলিম, মহিলা এবং যাদবদের সমর্থনেই পটনার মসনদে ‘হ্যারিকেন’ জ্বালিয়ে রাখতেন লালু। মমতার ক্ষেত্রেও জোড়া ‘এম’ সমীকরণের কথা পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে সর্বজনবিদিত। ‘মহিলা’ এবং ‘মুসলিম’। বৃহস্পতিবার যে পরিমাণ মহিলা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের মনের তল পেতেই আপাতত অঙ্ক কষছে তৃণমূল।

শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রথম দফার পূর্ণাঙ্গ হিসাব, পুরুষ এবং মহিলাদের ভোটদানের অনুপাত কত, সেই পরিসংখ্যান জানায়নি। তবে তৃণমূল যে হিসাব কষেছে, তাতে মহিলা ভোটের হার প্রায় ৯৩ শতাংশ! তুলনায় পুরুষদের ভোটের হার শতকরা ৯১ ভাগ। অর্থাৎ, পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের ভোটদানের হার ২ শতাংশের মতো বেশি। যদিও সংখ্যার ক্ষেত্রে তা প্রায় সমান সমান।

মহিলা ভোট যে মমতার দিক থেকে সরে গিয়েছে, তেমন কোনও নজির বিগত কোনও ভোটেই দেখা যায়নি। সর্বশেষ বড় ভোট ২০২৪ সালের লোকসভা। সেই ভোটের ফলাফলও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, মমতাতেই আস্থা রেখেছে রাজ্যের মহিলা ভোটের সর্বাধিক অংশ। আবার এ-ও বাস্তব যে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের দেড় মাসের মধ্যেই আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনার অভিঘাতে দিনের পর দিন রাজপথে ক্রোধান্বিত, ক্ষুব্ধ মহিলাদের গণস্রোত নেমে এসেছিল। রাতদখলের মেজাজের মধ্যে সরকার বিরোধিতার ঝাঁজও টের পাওয়া গিয়েছিল। যদিও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছে।

তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, আরজি করের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকেই রাস্তায় নেমেছিলেন বটে। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ করা। মমতার সরকারের বিরোধিতাকে শাণিত করা নয়। শাসকদলের অনেকের এ-ও ব্যাখ্যা যে, আরজি কর পর্বে যে আন্দোলন দেখা গিয়েছিল, তা মূলত সীমাবদ্ধ ছিল কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকায়। সেই ভিড়ে বাম ও বামমনস্ক মহিলাদের জমায়েত এবং সক্রিয়তা ছিল। যে অংশের সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক নেই। ফলে রাতদখলের মেজাজ ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে এবং তা বিজেপির দিকে গিয়েছে এমনটা অনেকেই মানতে রাজি নন।

আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজ্যের মন্ত্রী তথা মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য মহিলাদের বিপুল ভোটদানকে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘প্রচুর মহিলার নাম এসআইআরের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে সহ-নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে মতদান করেছেন। সঙ্গে আস্থা জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি। কারণ, তাঁরাও জানেন বিজেপি মহিলাদের কী চোখে দেখে আর দিদি মহিলাদের জন্য কী করেছেন।’’ বস্তুত, ভোটের লাইনে মহিলাদের ঢল নামাকে শুধুই লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রেক্ষিতে দেখতে চাননি চন্দ্রিমা।

তবে একান্ত আলোচনায় তৃণমূলের মধ্যে মহিলা ভোটদানের হার নিয়ে দু’টি দিক উঠে আসছে। একাংশের বক্তব্য, বেশ কিছু জেলায় সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা অনেকটাই ঠেকানো গিয়েছে। মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুর মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় মহিলারা সমর্থন জানিয়েছেন মমতার প্রতিই। আবার ‘রক্ষণশীল’ নেতাদের কারও কারও বক্তব্য, বিজেপি যে ভাবে হিন্দু ভোটকে একত্রিত করার কৌশল নিয়ে এগিয়েছে, তাতে হিন্দু মহিলাদের মধ্যে তৃণমূলের সমর্থন হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বেশ কিছু জেলায়। মেরুকরণের আবহ তীব্র, এমন এলাকায় এবং হিন্দুরা সংখ্যালঘু এমন বিধানসভা কেন্দ্রে হিন্দু মহিলাদের ভোটের সিংহভাগই যে তৃণমূলের বাক্সে পড়েছে, তা নিয়ে নিশ্চিত নন অনেকে।

এর উল্টো অভিমতও রয়েছে। সেই অংশের বক্তব্য, গত তিন মাস ধরে স্থানীয় স্তরে সাংগঠনিক প্রচারের কর্মসূচিতে যে পরিমাণ হিন্দু মহিলাদের কাছে পৌঁছোনো গিয়েছে, তা এক লহমায় মুছে যাবে, এমন হওয়ার কথা নয়। ১৫ বছরের স্থিতাবস্থা বিরোধিতার স্বাভাবিকতা মেনে নিচ্ছেন তৃণমূলের অনেকে। কিন্তু সে সব মেনেও তাঁদের বক্তব্য, দিদিই এখনও মহিলাদের কাছে ‘মসিহা’। এতএব, মহিলাদের এই বিপুল ভোট পদ্মে নয়, জমা পড়েছে কালীঘাটের দিদির পাদপদ্মে।

Advertisement
আরও পড়ুন