West Bengal Assembly Election 2026

জ্ঞানেশকে পত্রাঘাত মমতার! মধ্যরাতের বদলিকে ‘স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত' বললেন মুখ্যমন্ত্রী! চিঠির শেষে লিখলেন, ‘অল দ্য বেস্ট’

সোমবার লেখা চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার অব্যবহিত পরেই কমিশনের তরফে যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, তা রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যত নাড়িয়ে দিয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ০০:৩৬
(বাঁ দিকে) জ্ঞানেশ কুমার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) জ্ঞানেশ কুমার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট রবিবার ঘোষণার পর পরই রাজ্য প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। নির্বাচন ঘোষণার পর রবিবার গভীর রাতে রাজ্যের একাধিক শীর্ষ আমলা ও পুলিশ আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছে নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। চিঠির একেবারে শেষে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ‘শুভেচ্ছা’ও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

Advertisement

সোমবার লেখা ওই চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার অব্যবহিত পরেই কমিশনের তরফে যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, তা রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যত নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর দাবি, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র দফতরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা আধিকারিক এবং রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ পদ— ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (ডিজি)-সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একযোগে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও আগাম আলোচনা বা মতামত নেওয়া হয়নি বলেই মমতার অভিযোগ।

চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, নির্বাচনের সময় কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও এত বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘ দিনের প্রথা বা ‘কনভেনশন’ অনুসরণ করা হয়ে থাকে। তাঁর বক্তব্য, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। রাজ্যের কাছে কোন‌ও প্যানেল চাওয়া হয়নি, এমনকি, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোন‌ও অভিযোগ বা অসদাচরণের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এই বদলিকে তিনি ‘একতরফা’ এবং ‘স্বৈরাচারী’ সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন। চিঠিতে তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, ভারতের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত। পাশাপাশি, ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনের কর্তৃত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেই সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে একটি প্রশাসনিক সৌজন্য বজায় রাখা হয় বলেই তিনি দাবি করেন।

মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই সৌজন্যই দেশের সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এ বারের সিদ্ধান্ত সেই কাঠামোর পরিপন্থী বলেই তিনি মনে করছেন। মমতার মতে, বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানদের এ ভাবে সরিয়ে দেওয়া নজিরবিহীন। এতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন।

এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অতীতের কয়েকটি ঘটনার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। আগের বিভিন্ন নির্বাচনে কমিশন যখনই গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি করেছে, তখন রাজ্যের সঙ্গে আলোচনার একটি প্রক্রিয়া বজায় রাখা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এ বার কেন সেই রীতি অনুসরণ করা হল না?

চিঠির আর একটি অংশে মমতা নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘ দিনের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি হল নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততা। একতরফা সিদ্ধান্ত সেই ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলেও তিনি ‘সতর্ক’ করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে কমিশনের কাছে আর্জি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হোক এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রীতি অনুসরণ করা হোক। এতে এক দিকে যেমন প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় থাকবে, অন্য দিকে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও আস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

প্রসঙ্গত, এসআইআর ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী এর আগেও একাধিক বার জ্ঞানেশকে চিঠি দিয়েছেন। তবে সোমবার রাতে যে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে, তার প্রশাসনিক তাৎপর্য অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। নবান্ন সূত্রের দাবি, নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রশাসনের শীর্ষস্তরে হঠাৎ করে এই ধরনের রদবদল হলে চলমান প্রশাসনিক কাজের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি বলে রাজ্যের বক্তব্য। নবান্ন থেকে পাঠানো মুখ্যমন্ত্রীর এই চিঠি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার পরিসর তৈরি করে দিয়েছে। শাসকদলের তরফে কমিশনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হলেও বিরোধী শিবিরের একাংশ আবার দাবি করছে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ ভাবে পরিচালনা করতে কমিশনের এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।

অন‍্য দিকে, রাজনৈতিক মহলের নজর এখন নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়ার দিকে। মুখ্যমন্ত্রীর এই চিঠির জবাবে কমিশন কোন‌ও ব্যাখ্যা দেয় কি না, সেই দিকেই নজর রাখছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল। সব মিলিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের শুরুতেই রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এই টানাপোড়েন আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কম্পিউটারে টাইপ করা চিঠির একেবারে শেষে জ্ঞানেশের উদ্দেশে মমতার হাতে লেখা ‘অল দ্য বেস্ট’-এর‌ ব্যাখ‌্যা নিজেদের মতো করে করছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল।

Advertisement
আরও পড়ুন