CPM Campaign 2026

শূন্যগ্রহণ কাটাতে উত্তরপাড়ায় মিনাক্ষীর প্রচারে ‘দিদিকে বলো’! মুর্শিদাবাদের বাছাই করা কেন্দ্রে বামেরা নীরবে ‘শুভেন্দু লাইনে’

উত্তরপাড়ায় গত পাঁচ বছর তৃণমূলের বিধায়ক ছিলেন অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক। অভিযোগ, তাঁকে সে ভাবে এলাকায় দেখা যায়নি। সেটা কাজে লাগাতেই মিনাক্ষীর প্রচারে ফোন নম্বর বিলির পথে হাঁটছে সিপিএম।

Advertisement
শোভন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৫

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

শূন্যগ্রহণ কাটাতে মরিয়া সিপিএম প্রচারের ধাঁচে অনুসরণ করছে যুযুধান দুই প্রতিপক্ষকে। আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখে না-বললেও ধাঁচে তা স্পষ্ট। একান্ত আলোচনায় নেতারা মেনে নিচ্ছেন, মার্কশিট থেকে শূন্য কাটাতে বেশ কিছু কৌশল তাঁদের নিতে হচ্ছে।

Advertisement

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের সৌজন্যে ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি শুরু করেছিল রাজ্য সরকার। একটি নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করে সাধারণ নাগরিকেরা তাঁদের এলাকার সমস্যা মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে জানাতেন। নাগরিকদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি সেতুবন্ধন ঘটাতেই ওই কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল। উত্তরপাড়ার সিপিএম প্রার্থী মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের প্রচারেও বাড়ি বাড়ি একটি কার্ড বিলি করা হচ্ছে। যার এক দিকে রয়েছে আরজি করের নির্যাতিতার শববাহী গাড়ি আটকানোর মুহূর্তের ছবি। অন্য দিকে রয়েছে মিনাক্ষীর ছবি সংবলিত একটি ফোন নম্বর। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলা হচ্ছে, যে কোনও সমস্যায় মিনাক্ষীকে ডাকলেই তাঁরা পাবেন। ওই নম্বরে জানাতে পারবেন সমস্যার কথাও।

উত্তরপাড়ায় গত পাঁচ বছর তৃণমূলের বিধায়ক ছিলেন অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক। অভিযোগ, তাঁকে সে ভাবে এলাকায় দেখা যায়নি। সেই ক্ষোভ কাজে লাগাতেই এ হেন ফোন নম্বর বিলির পথে হাঁটছে সিপিএম। প্রসঙ্গত, গত দু’মাস ধরে উত্তরপাড়ার পাড়ায় পাড়ায় চষে বেড়াচ্ছেন মিনাক্ষী। যা থেকে স্পষ্ট ছিল যে, ওই বিধানসভায় তিনি প্রার্থী হচ্ছেন। তালিকা প্রকাশের পর তাতে কেবল সিলমোহর পড়েছে। যে নম্বরটি বাড়ি বাড়ি বিলি করা হচ্ছে, তাতে আনন্দবাজার ডট কম রবিবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বার তিনেক ফোন করেছিল। কিন্তু বেজে ফোন গিয়েছে। কেউ ধরেননি। তবে সূত্রের খবর, এক মহিলা ওই নম্বরটি ধরে কথা বলছেন। তিনিই মিনাক্ষীর প্রতিনিধি হিসাবে সমস্যা জেনে নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ‘দিদিকে বলো’তে ফোন করেও কেউ মমতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারতেন না। সিপিএম-ও তাদের ‘দিদির দূত’কে ফোন ধরার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে।

এ হেন প্রচার কৌশল নিয়ে উত্তরপাড়ার প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক তথা এ বারের ভোটে মিনাক্ষীর স্থানীয় অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া শ্রুতিনাথ প্রহরাজ বলছেন, ‘‘মানুষ মিনাক্ষীকে ভরসা করছেন। তাঁরা যাতে সরাসরি তাঁদের কথা জানাতে পারেন, তাই আমরা এই কার্ড বিলি করছি। প্রচারে গেলে অনেক সময়ে অনেকে বাড়িতে থাকছেন না। এর ফলে তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ সুনিশ্চিত হবে।’’ এটা কি সিপিএমের ‘দিদিকে বলো’? মমতার সেই উদ্যোগের সঙ্গে জুড়ে থাকা কর্মসূচির বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাবে মানতে চাননি বাণিজ্যের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শ্রুতিনাথ। তাঁর কথায়, ‘‘ওটা তো একটা ফ্লপ কর্মসূচি! সেটাকে আমরা অনুসরণ করতে যাব কেন?’’ তবে গত লোকসভা নির্বাচনে দীপ্সিতা ধরের সৌজন্যে ৫০ হাজার ভোটের ভিত তৈরি হওয়া উত্তরপাড়ায় মিনাক্ষীকে লড়তে পাঠানোর নেপথ্যে যে কয়েক জন সিপিএম নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন, তাঁদের একজনের বক্তব্য, ‘‘মডেল তো অনুসরণ করাই যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তো আমাদের জমি আন্দোলন অনুসরণ করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। এতে অন্যায় কী?’’

নিশ্চয়ই অন্যায় নেই। কিন্তু সেই ন্যায়ের কথা প্রকাশ্যে বলাও যায় না। কারণ সেটি ‘কৌশল’। ভোটের সময়ে নিজেদের মতো কৌশল নেয় সব দলই। যেমন শূন্যের গেরো কাটাতে সিপিএম যে যে আসনগুলিতে মনোনিবেশ করেছে, তার বেশ কয়েকটি মুর্শিদাবাদে। নবাবের জেলায় যে আসনগুলিতে ১৮-৩০ শতাংশ পর্যন্ত হিন্দু ভোট রয়েছে, সেখানে নীরবে একটি কথা বলে চলেছেন নিচুতলার সিপিএম সংগঠকেরা। যা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘লাইন’। শুভেন্দু গত কয়েক বছর ধরেই বলে আসছেন, তৃণমূলকে হারাতে হলে ‘হিন্দু কমরেড’দের ভোট দিতে হবে বিজেপি-কে। লোকসভা নির্বাচনের পরে শুভেন্দু হিসাব দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন দমদম, ব্যারাকপুরের মতো আসনে বাম প্রার্থীরা ভোট না-কাটলে তৃণমূল পরাস্ত হত। সৌগত রায়, পার্থ ভৌমিকদের বদলে সংসদে যেতেন শীলভদ্র দত্ত, অর্জুন সিংহেরা। বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুর্শিদাবাদের লালগোলা, জলঙ্গির মতো আসনগুলিতে সিপিএম তলায় তলায় একটি বিষয় ছড়িয়ে দিতে চাইছে। তা হল, এই সব কেন্দ্রে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। এখানে বিজেপির জেতার অবকাশ নেই। আবার সংখ্যালঘুদের মধ্যে সিপিএমের ২০-২৫ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। ফলে তৃণমূলকে হারাতে হলে হিন্দুদের উচিত সিপিএম-কে ভোট দেওয়া।

আনুষ্ঠানিক ভাবে সিপিএম এ কথা স্বীকার করবে না। সেটাই স্বাভাবিক। প্রকাশ্যে সে কথা বলতে শুরু করলে দক্ষিণবঙ্গের হিন্দু বাম ভোটে আরও ক্ষয় হতে পারে। আবার শূন্যদশা কাটাতেও তৎপর দল। ফলে সিপিএমের অবস্থা কিছুটা শাঁখের করাতে পড়ার মতো হয়েছে। সিপিএমের মুর্শিদাবাদের জেলা সম্পাদক জ়ামির মোল্লা বলেন, ‘‘ধর্মকে সরিয়ে রেখে আমরা রুটি-রুজির কথাই বলছি প্রচারে।’’ কিন্তু শোনা যাচ্ছে, নিচুতলায় হিন্দু ভোট এককাট্টা করতে তাঁরা বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন? জ়ামিরের জবাব, ‘‘ভোট চাইতে গিয়ে কত লোকেই তো কত কথা বলে!’’ জ়ামির আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করেননি। আবার বিষয়টি একেবারে উড়িয়েও দেননি। তবে ঔপচারিক ভাবে বোঝাতে চেয়েছেন, এ হেন প্রচারের দায় দলের নয়।

সিপিএম-ও জানে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সবক’টি বড় ভোটে বামেদের ভোট বিজেপি-তে গিয়েছে। এত দিন পর্যন্ত প্রকাশ্যে সে কথা স্বীকার না-করলেও সম্প্রতি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে পাশে বসিয়ে প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী তথা শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র অশোক ভট্টাচার্য বলে দিয়েছেন, “গত তিনটি নির্বাচনে তৃণমূলকে হারানোর নাম করে বামপন্থীরা বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন। এই ভুল আর করবেন না।”

উত্তরপাড়া থেকে থেকে জলঙ্গি, লালগোলা— শূন্যগ্রহণ কাটাতে প্রতিপক্ষের কৌশলকে ‘আত্মীকরণ’ করছে সিপিএম। শূন্যের গেরো কাটবে কি? জবাব মিলবে আগামী ৪ মে।

Advertisement
আরও পড়ুন