পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার। ছবি: ফেসবুক।
কালীঘাট থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে ভবানীপুর কেন্দ্রের গণনাপ্রক্রিয়া নিয়ে যে সমস্ত অভিযোগ তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তা খারিজ করে দিলেন কলকাতা দক্ষিণের জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) রণধীর কুমার। বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছেন, মমতার সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং মনগড়া।
মমতার অভিযোগ, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ভোট গণনাকেন্দ্রে তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, তাঁর পেটে লাথি মারা হয়েছে। সেই সময়ে সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল বলে দাবি করেছেন মমতা। এই অভিযোগের পরেই ডিইও বিবৃতি দেন। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘ভবানীপুরের তৃণমূল প্রার্থী সাংবাদিক বৈঠক করে যে সমস্ত অভিযোগ তুলেছেন, সেগুলি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। গণনা প্রক্রিয়া স্বাধীন, স্বচ্ছ ভাবে নির্বাচন কমিশনের সমস্ত নিয়ম মেনে হয়েছে। সিসিটিভি কখনওই বন্ধ করা হয়নি। তৃণমূল প্রার্থী তথা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা মনগড়া, ভিত্তিহীন। গণনা সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল কারণ, উনি বন্ধ করার জন্য জেদ করেছিলেন। তবে পরে নির্দেশিকা অনুযায়ী তাঁকে জানিয়ে গণনা আবার শুরু হয়।’’ সাংবাদিক বৈঠকে এই ডিইও রণধীরের কথা উল্লেখ করেছিলেন মমতা। অভিযোগ, ডিইও কিছু দিন আগে কোনও এক জনকে বলেছিলেন, ‘গণনায় খেলা হবে।’ সেই সংক্রান্ত প্রমাণও তাঁর কাছে আছে বলে দাবি করেছিলেন তিনি। সেই অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিইও-র বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি।
মঙ্গলবার মমতার সঙ্গে সাংবাদিক বৈঠকে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং ফিরহাদ হাকিম। মমতা জানিয়েছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেবেন না। রাজভবনে যাবেন না। দাবি, আদৌ হারেনি তৃণমূল, ভোট লুট করা হয়েছে। ১০০-র বেশি আসন লুট করে বিজেপি জিতেছে বলে অভিযোগ মমতার। তিনি জানিয়েছেন, দেশে বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের হাত আরও শক্ত করবেন তিনি। তবে আগামী দিনে তৃণমূল কোন কৌশলে এগোবে, তা গোপনেই রাখতে চান দলনেত্রী।
গণনাকেন্দ্রের ভিতর শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগ তুলেছেন মমতা। বলেছেন, ‘‘সাখাওয়াতে আমার এজেন্টদেরও ঢুকতে দেয়নি। ভিতরে ওরা আমার পেটে লাথি মেরেছে, পিছনে লাথি মেরেছে। সিসিটিভি বন্ধ ছিল। যা হয়েছে, তাতে মহিলা হিসাবে আমি অপমানিত। আমার সঙ্গেই এটা হল, তা হলে অন্যদের কী ভাবে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে। দল কর্মীদের পাশে আছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। ঘুরে দাঁড়াব।’’
মমতা জানিয়েছেন, দেশে বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’কে শক্তিশালী করাই এখন তাঁর লক্ষ্য। ইতিমধ্যে জোটের নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছেন। সনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরীবাল, উদ্ধব ঠাকরে, অখিলেশ যাদব, হেমন্ত সোরেনরা তাঁকে ফোন করে পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। মমতা বলেন, ‘‘জোট আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হবে। অখিলেশ আজ আসতে চেয়েছিল। আমি কাল আসতে বলেছি। একে একে সকলেই আসবেন। জোট শক্তিশালী করব।’’
মমতার দাবি, গণনাকেন্দ্রের ভিতর থেকে কর্মীদের সরিয়ে দিয়ে ভোট লুট করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাতেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অভিযোগ, শুরু থেকেই বিজেপি-কে এগিয়ে রাখায়, তারা ২০০ পেরিয়ে গিয়েছে বলে সম্প্রচার করায় বিজেপির সুবিধা হয়েছে। মমতা বলেন, ‘‘কিছু ক্ষণ গণনার পরেই বিজেপির লোকজন গণনাকেন্দ্রের ভিতরে ঢুকে মারধর শুরু করে। ১৩ হাজার ভোটে আমি লিড করছিলাম। ৩২ হাজারের বেশি পাওয়ার কথা ছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে ওরা গণনাকেন্দ্রে ঢুকেছে। সব ভেঙে দিয়েছে। এটা শুনেই আমি গেলাম। জগুবাবুর বাজারের কাছে আমার গাড়ি আটকাল। বলল যেতে দেবে না। রিটার্নিং অফিসারের কাছে তা নিয়ে আমরা লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।’’ এই কারণেই পদত্যাগ করবেন না বলে জানিয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘কেন লোক ভবনে গিয়ে পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে।’’
জেতার পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা ভোট-পরবর্তী হিংসায় লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মমতা। দাবি, এই সন্ত্রাসের ছবি অতীতের সমস্ত নিদর্শনকে ছাপিয়ে গিয়েছে। জেলায় জেলায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় দখল করা থেকে শুরু করে মহিলাদের মারধর, ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ মমতার। তিনি বলেন, ‘‘আমরা যখন জিতেছিলাম, বলেছিলাম, বদলা নয়, বদল চাই। কারও উপর যেন অত্যাচার না হয়, সেটা দেখেছিলাম। সিপিএমের কোনও পার্টি অফিসে আমরা হাত দিইনি। কোনও অত্যাচার করিনি। কিন্তু এরা মহিলাদেরও ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে! ভাবা যায়? এটা কোনও রাজনৈতিক দল করতে পারে?’’ মমতা আরও বলেন, ‘‘২০০৪ সালেও আমি এই জিনিস দেখিনি। ১৯৭২ সালের সন্ত্রাসের কথা শুনেছি। তবে তা চোখে দেখিনি, তাই বলতে পারব না। কিন্তু এই সন্ত্রাস সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে।’’ ভোট-পরবর্তী হিংসার খোঁজ নিতে ১০ সদস্যের তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গড়বে তৃণমূল। তাতে পাঁচ জন সাংসদও থাকবেন।
পরাজয়ের পর তাঁর চেয়ার আর নেই। তাই তিনি মুক্ত বিহঙ্গ, দাবি মমতার। জানিয়েছেন, তিনি রাস্তায় ছিলেন এবং রাস্তাতেই থাকবেন। বিজেপির অভিযোগ আর মুখ বুজে সহ্য করবেন না। মমতা বলেন, ‘‘এত দিন আমি চেয়ারে ছিলাম। অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ। সাধারণ মানুষ। আর সহ্য করব না। সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমি রাস্তার লোক। রাস্তায় ছিলাম, রাস্তায় থাকব।’’
মমতা জানিয়েছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই ছিল না। লড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি এমনি জিতলে কোনও অভিযোগ থাকত না। ভোটে হার-জিত থাকেই। কিন্তু তা হয়নি। আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বিজেপির বিরুদ্ধে আমাদের এই লড়াই ছিল না। নির্বাচন কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করল। কমিশনই ভিলেন। তারা মানুষের অধিকার লুট করেছে। ভোটের আগে সব জায়গায় রেড করেছে। সব অফিসারকে বদলে দিয়েছে। বিজেপি আর কমিশনের মধ্যে বেটিং হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।’’