বরকমতলায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা রয়েছে বাজির দোকান। —নিজস্ব চিত্র।
উৎসবের মরসুম নয়, তবু রাস্তার ধারে একের পর এক দোকানে নিষিদ্ধ বাজির পসরা সাজিয়ে বসে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মধ্যে আছেন মহিলারাও। ওই সমস্ত দোকানে রয়েছে নিষিদ্ধ আতশবাজি ও শব্দবাজি-সহ নানা ধরনের অবৈধ বাজি। ক্রেতারা সারা দিনই আসেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে দোকান, দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিধানসভা নির্বাচনের মুখে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে বাজি কারখানায় উৎপাদন এবং বাজি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদিও মহেশতলা এবং বজবজের নুঙ্গি, বরকমতলা ও পুটখালি এলাকায় গেলে বোঝারই উপায় নেই যে, এমন কোনও বিধি এ রাজ্যে বলবৎ করা হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার শব্দবাজির ‘আঁতুড়ঘর’ বলে পরিচিত এই সমস্ত এলাকার ১২-১৩টি গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে বাজি তৈরির কারখানা যেন কুটির শিল্প। বিভিন্ন সময়ে সেই সব কারখানায় বিস্ফোরণ ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। বরকমতলা, পুটখালি, দৌলতপুর বা চিংড়িপোঁতায় প্রায় ৪০ হাজার পরিবারের একমাত্র উপার্জনের পথ বাজি তৈরি। সেখানে গোপনে শব্দবাজি, অর্থাৎ চকলেট বোমা তৈরি হয় প্রায় সব ঘরেই। ঘরেই মজুত রাখা হয় শব্দবাজি। বাজির মশলা এবং রাসায়নিকও রাখা হয় সেখানেই।
বরকমতলার সমস্ত দোকানেই বিক্রি হয় শব্দবাজি। আতশবাজির আড়ালে সেগুলি বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ। ওই গ্রামে গেলে দেখা যায়, বাঁশবাগানের ভিতরে বা পুকুরের ধারে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট কারখানা। গত মাসখানেক ধরে সেখানে নিয়মিত পুলিশি তল্লাশি চলছে। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলা সূত্রের দাবি, উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১৫০ কেজি নিষিদ্ধ বাজি। তার মধ্যে আতশবাজির সঙ্গে রয়েছে শব্দবাজিও। বাজি মজুত রাখার অভিযোগে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাজির ব্যবসা বন্ধ হয়নি কেন? এই প্রশ্নের সরাসরি কোনও জবাব দিতে পারেননি ‘অল বেঙ্গল তৃণমূল গ্রিন ফায়ার ক্র্যাকার্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিয়ন’-এর সাধারণ সম্পাদক শুকদেব নস্কর। তিনি বললেন, ‘‘বাজি তৈরি বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিক্রির বিষয়ে কোনও নিষেধাজ্ঞার কথা আমরা জানি না। বিয়েবাড়ি-সহ নানা অনুষ্ঠানের জন্য আতশবাজি কিনতে অনেক ক্রেতা আসেন। তাই দোকান খোলা রাখা হয়েছে।’’ কিন্তু ওই সব গ্রামে চকলেট-সহ অন্যান্য বোমা তৈরি হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনও জবাব দিতে পারেননি শুকদেব। তাঁর কথায়, ‘‘বাড়ির ভিতরে কেউ লুকিয়ে শব্দবাজি তৈরি করলে তা জানব কী ভাবে? আমি নিশ্চিত নই। পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী, ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের বাজি তৈরি করতে নিষেধ করা হয়েছে। পুলিশও তল্লাশি অভিযান করছে।’’
বরকমতলার বাজি ব্যবসায়ী সমর কয়াল সকাল থেকে দোকান খুলে বসে রয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বাজি তৈরি বন্ধ রয়েছে বলে ইউনিয়ন থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু বাজি বিক্রি বন্ধের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তবে, এখন তেমন বিক্রিও নেই। আমার বাড়ির একতলায় দোকান। সময় কাটানোর জন্য খুলে বসে আছি। ক্রেতা নেই।’’ তিনি বললেন, ‘‘কয়েক দিন আগেই মিছিল হল। বাজি বিক্রি বন্ধ করার বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’’ আর এক ব্যবসায়ী বললেন, ‘‘দোকানে যত বাজি দেখছেন, তার সবই দক্ষিণ ভারতের শিবকাশিতে তৈরি। কিনে এনে বিক্রি করছি। তবে, বাজি বিক্রি বন্ধের বিষয়ে আমাদের কিছু বলা হয়নি।’’
ওই সমস্ত এলাকার বাসিন্দাদের কথায়, ‘‘বাড়ির ছোট ছোট কারখানায় কেউ কেউ শব্দবাজি তৈরি করছেন। এখন ইদের ছুটি চলছে বলে কারিগরেরা অনেকেই আসছেন না। তাই এলাকায় আপাতত বাজি তৈরি বন্ধ। কারিগরেরা ফিরে এলে হয়তো কাজ শুরু হবে। চকলেটের কারিগরেরা বড় বোমা তৈরি করতেও পারদর্শী। ভোটের সময়ে তো চকলেটের কারিগরেরাই বড় বোমা তৈরি করেন। বেশি দামে সেগুলি বিক্রি হয়।’’
বরকমতলার খাঁ-পাড়া ও কতবেলতলার মতো গ্রাম শব্দবাজি তৈরির জন্য বিখ্যাত। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, এলাকায় অচেনা লোকের আগমন দেখেই বাসিন্দারা যেন একটু সতর্ক। বাজি তৈরির বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হলেও কেউ টুঁ শব্দও করলেন না। তাঁদের একটাই কথা, প্রশাসন সব নজরে রাখছে। বাজি তৈরি করা হচ্ছে না। এলাকার এক বাজি ব্যবসায়ী বললেন, ‘‘ইদের ছুটিতে কারিগর নেই। বাজিও তৈরি হচ্ছে না। গ্রামে এখন বারুদের গন্ধ পাবেন না। কারিগরেরা ফিরে এলেই কাজ শুরু হবে।’’
তবে, ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার কর্তাদের কথায়, ‘‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশের পরে সমস্ত কিছু গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবাইকে সচেতন করার জন্য প্রচার চলছে। বাজি তৈরি ও বিক্রি করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।’’
(শেষ)