—প্রতীকী চিত্র।
প্রচারের শেষ লগ্নে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলে গিয়েছেন, নতুন বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাঁকে আসতেই হবে! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দু’দফার ভোটে ঘাঁটি গেড়ে থেকেছেন, নজরদারি চালিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, বিজেপির সরকার গঠনের প্রশ্নে কোনও সংশয় নেই। ভোট মিটতেই যে একাধিক বুথ-ফেরত সমীক্ষার ফল আসতে শুরু করেছে, তার মধ্যে বেশ কিছু সমীক্ষাতেও বিজেপির জন্য ‘ইতিবাচক’ ইঙ্গিত আছে। কেবল অঙ্কের হিসেব নয়, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ার জাদু সংখ্যায় পৌঁছনোর রসায়ন কি আয়ত্ত করতে পারছে বিজেপি? পদ্ম শিবিরের যুক্তি, তাদের আত্মবিশ্বাসের কারণ একাধিক।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফল জানার জন্য অপক্ষা করতে হবে আগামী ৪ মে পর্যন্ত। তার আগে জারি আছে নানা বিশ্লেষণ। স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে এ বার বিধানসভায় ভোটদানের হার নজির গড়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ৮৩ লক্ষ ৮৬ হাজার (প্রায় ১২%) কমে যাওয়ায় ভোটদানের শতাংশের হিসেব ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তারই পাশাপাশি গত বারের তুলনায় দু’দফা মিলিয়ে ৩০ লক্ষের বেশি ভোট পড়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, এর মধ্যে প্রথম বারের বা নতুন ভোটারদের সঙ্গেই আগে ভোট দিতে আসেননি, এমন মানুষও আছেন। ভিন্ রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকেরা এসআইআর-এর পরে দলে দলে ভোট দিতে এসেছেন এ বার। বাড়তি ভোটের পরিমাণের নেপথ্যেও ফায়দা দেখছে বিজেপি।
বিজেপি শিবিরের একটি সূত্রের মতে, এসআইআর-এর পরে সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে আতঙ্ক বেড়েছে বেশি। তার জেরে সংখ্যালঘু এলাকায় ভোটদানের উৎসাহও ছিল বেশি। পরিযায়ী শ্রমিক যাঁরা ফিরেছেন, তাঁদের মধ্যেও মুসলিম ও হিন্দু, দুই সম্প্রদায়ের মানুষই আছেন। বিজেপির ওই সূত্রের হিসেব, সংখ্যালঘু ভোটারেরা ১০০% ভোট দিলেও আগের বিধানসভা নির্বাচনের চেয়ে মুসলিম ভোট চার লক্ষ কম হবে। কারণ, এসআইআর সংখ্যালঘু ভোটের ভিত্তিরেখা নামিয়ে দিয়েছে। আর আগের চেয়ে এগিয়ে হিন্দু ভোটারের ৯০% এ বার ভোট দিলেও সেই অংশের ভোট ৩৪ লক্ষ বেশি হবে। ফলে, বাড়তি হিন্দু সমর্থন তাদের বাক্সে যাবে বলে বিজেপি শিবিরের আশা। একই আশা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নিয়েও।
সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি দুই রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল একেবারে পিছন থেকে উঠে এসে। ত্রিপুরায় বিজেপির সরকার হয়েছিল বামেদের হারিয়ে, তার আগে বিজেপির সরাসরি ক্ষমতায় চলে আসার কোনও অঙ্ক বা ইঙ্গিত সেখানে ছিল না। ওড়িশায় বিজেপি মসনদে পৌঁছেছে নবীন পট্টনায়কের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে। দুই লড়াই-ই ছিল পুরোদস্তুর রাজনৈতিক। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও কোনও পুরসভা নেই, একেবারে বিধানসভার দখল নেওয়ার ঘটনা ঘটাতে হবে! তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত একটা বিরাট অংশের মানুষ রয়েছেন। এই সুবিধাভোগী অংশকে কি জয় করা সহজ? বিজেপির এক রাজ্য নেতার মত, ‘‘গ্রামাঞ্চলে যে মানুষ সুবিধা পান, তিনি একই সঙ্গে তাঁর পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ির চেহারা, বাড়ির সামনে গাড়িও দেখছেন। শুধু সুবিধার জন্য ভোট হচ্ছে না। ভুক্তভোগী মানুষের ক্ষোভও আছে।’’
প্রথম দফার ভোটের পরে সরকার গড়া নিশ্চিত বলে দাবি করে আরও আগ্রাসী প্রচার চালিয়েছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালির মধ্যে বিজেপি সম্পর্কে যে ‘অনীহা’ সচরাচর কাজ করে এসেছে, সেই মনোভাব কি এর জেরে দ্বিতীয় দফার ভোটে আরও উস্কে যেতে পারে না? রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতার দাবি, ‘‘অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হওয়ার ফলে মানুষ নিশ্চিন্তে ভোট দিয়েছেন। অনেকে আগে দিতে পারেননি, এ বার দিয়েছেন। এই ঘটনা আমাদের পক্ষে যাবে। নতুন প্রজন্মের সমর্থনও পাব। রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা সরিয়ে অন্য নানা দলের সমর্থক বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, তার ইঙ্গিত আমরা পাচ্ছি।’’
রাজ্যে প্রথম দফার ভোটে অন্তত ৯০টি আসন তাদের ঘরে আসবে বলে বিজেপির বড় অংশই আশাবাদী। দ্বিতীয় দফায় আরও প্রায় ৬০টি আসন পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত বলয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব না-হলেও অঙ্কের বিচারে কঠিন বটে! বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য মনে করেন, এই রাজ্যে বিজেপির উত্থান বড় বড় লাফ দিয়েই হয়েছে। বিজেপি ২০১৬ সালের তিন আসন থেকে ২০২১-এ ৭৭-এ পৌঁছেছিল। সেখান থেকে ২০২৬-এ ১৭০-এও যেতে পারবে। আর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘এই ভোট প্রত্যাখ্যানের ভোট। মানুষ তৃণমূলের হাত থেকে মুক্তি চাইছেন। বিজেপির সরকার নিশ্চিত!’’
হিসেব মেলানোর পালা ৪ তারিখ!