BJP Slogan

‘বাঙালি হিন্দুত্ব’ নয়, বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার কাছে সহজতর স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’! সংগঠনে রামের জয়ধ্বনির বার্তা আলির

রাজ্য বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চা কি দলের এই এই নতুন কৌশল রপ্ত করতে পেরেছে? সংখ্যালঘু মোর্চার পক্ষে সরাসরি ‘জয় মা কালী’ বা ‘জয় মা দুর্গা’য় অভ্যস্ত হওয়া কঠিন। বরং ‘জয় শ্রীরাম’ তাঁদের কাছে সহজ।

Advertisement
ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৭
Is Bengal BJP’s Jay Maa Kali slogan difficult for Minority Morcha? Messaging on across ranks in the organisation for hailing Lord Ram

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মুহুর্মুহু ‘জয় মা কালী’ স্লোগান তুলছেন নেতারা। অবশ্য দলের জন্মলগ্ন থেকে যে ‘জয় শ্রীরাম’ শুনতে এবং বলতে কর্মী-সমর্থকরা অভ্যস্ত ছিলেন, তা ব্রাত্য নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে রামের আগে কালী বা দুর্গার নাম নেওয়া শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্ব কি ‘সাধারণ হিন্দুত্ব’ ছেড়ে ‘বাঙালি হিন্দুত্বের’ দিকে এক ধাপ এগিয়েছেন? বিজেপি নেতারা এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিচ্ছেন না। কিন্তু দলের এই নতুন স্লোগানের ফলশ্রুতিতে সংখ্যালঘু মোর্চাকে ‘জয় শ্রীরাম’-এর পক্ষে তৎপর হতে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি-তে সংখ্যালঘু কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা নগণ্যই। তবু যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের পক্ষে ‘জয় মা কালী’ বা ‘জয় মা দুর্গা’র চেয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ই সহজ হচ্ছে। সে স্লোগান কেন সংখ্যালঘুর জন্য ‘উপযুক্ত’, সংগঠনের নানা স্তরে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে শুরু করেছেন সংখ্যালঘু মোর্চার রাজ্য নেতৃত্ব।

Advertisement

গত ৩ জুলাই কলকাতায় সায়েন্স সিটি ময়দানে ম্যারাপ বেঁধে ‘রাজ্যাভিষেক’ হয়েছিল বিজেপি-র বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের। মঞ্চের এলইডি-দেওয়ালে বার বার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল কালীঘাটের বিগ্রহের ছবি। ‘জয় শ্রীরাম’ শিবিরে ‘কালী’র বন্দনা নতুন রাজনৈতিক কৌশল কি না, তা নিয়ে সে দিনই জল্পনা শুরু হয়েছিল। দু’সপ্তাহ পরে দুর্গাপুরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভার আগের দিন জল্পনার অবসান ঘটেছিল। নরেন্দ্র মোদীর সভায় যোগদানের আহ্বান জানিয়ে যে ছাপানো চিঠি বিলি করা হচ্ছিল বিজেপি-র তরফে, তার শুরুতেই লেখা হয়েছিল ‘জয় মা কালী, জয় মা দুর্গা’। স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, শুধু হিন্দুত্বে নয়, পশ্চিমবঙ্গের জন্য ‘বাঙালি হিন্দুত্বে’ শান দিতে শুরু করেছে বিজেপি। তার পর থেকে নানা মঞ্চে, নানা কর্মসূচিতে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বার বার ‘জয় মা কালী’ স্লোগান তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী-সহ বিজেপির অন্য কেন্দ্রীয় নেতারাও পশ্চিমবঙ্গে এসে ‘জয় মা কালী’ বলা অভ্যাসে পরিণত করেছেন। এমনকি, গত বৃহস্পতিবার ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পেশ পর্বের জন্য অমিত শাহ যে রোড শো করেছেন, সেখানেও শমীক বার বার ‘জয় মা কালী’ স্লোগানই তুলেছেন।

রাজ্য বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চা কি দলের এই এই নতুন কৌশল এখনও রপ্ত করতে পেরেছে? বিজেপি সূত্র বলছে, সংখ্যালঘু মোর্চার পক্ষে সরাসরি ‘জয় মা কালী’ বা ‘জয় মা দুর্গা’য় অভ্যস্ত হওয়া কঠিন। বরং ‘জয় শ্রীরাম’ তাঁদের কাছে সহজ। কেন সহজ, তা ইতিমধ্যেই সংগঠনের অন্দরে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছেন সংখ্যালঘু মোর্চার রাজ্য সভাপতি আলি হোসেন। মার্চের শেষ সপ্তাহে তিনি সংগঠনের বেশ কয়েকজন পদাধিকারীকে নিয়ে রাজ্য বিজেপির বিধাননগর দফতরে একটি বৈঠক করেন। ‘জয় শ্রীরাম’ বলায় মুসলিমদের কেন আপত্তি থাকা উচিত নয়, তা তিনি সেই বৈঠকে ব্যাখ্যা করেছেন। দলের সর্ব স্তরে সেই ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়ার বার্তাও তিনি পদাধিকারীদের দিয়েছেন।

বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চাকে আলি বলেছেন, ‘‘জয় শ্রীরাম কোনও ধর্মীয় স্লোগান নয়। এটি সুশাসন এবং সুশাসকের পক্ষে স্লোগান। তাই মুসলিমদের জয় শ্রীরাম বলায় কোনও বাধা নেই।’’ পরে আনন্দবাজার ডট কম-কে আলি বলেন, ‘‘ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে হিন্দুরা উপাস্য হিসাবে দেখেন, সে কথা ঠিকই। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিতে সুশাসন এবং সুশাসকের যে ধারণা, তা রামরাজ্য তথা রামের নামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। তাই আমরা যখন রামের নামে জয়ধ্বনি করি, তখন আসলে একজন সুশাসক, একজন নিষ্ঠাবান রাজনীতিকের নামে জয়ধ্বনি করি।’’ আলি আরও বলছেন, ‘‘রামচন্দ্র শুধু হিন্দুদের নন। যে যুগে রামচন্দ্র ছিলেন, সে যুগে এ দেশে কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ খ্রিস্টান ছিলেন না। সকলে একই ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাই এ দেশে আমাদের সকলের পূর্বপুরুষ রাম। তাঁর নামে জয়ধ্বনি দিতে আমাদের কারও সমস্যা থাকার কথা নয়।’’

সংখ্যালঘু মোর্চার রাজ্য সভাপতির এই ব্যাখ্যা তথা বার্তা সংগঠনের নানা স্তরে পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে। তাতে সাড়া কেমন, আলি সে বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিচ্ছেন না। তিনি বলছেন, ‘‘বিজেপি-র সংখ্যালঘু মোর্চায় থাকলে কারওকে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানো হবে, এমন তো নয়। যাঁর আপত্তি থাকবে, তিনি না-বলতেই পারেন। কিন্তু ‘জয় শ্রীরাম’ যে ধর্মীয় স্লোগান নয়, মুসলিমেরও যে এই স্লোগানে গলা মেলাতে বাধা নেই, সেই কথাটুকু আমরা তুলে ধরছি।’’

প্রধানমন্ত্রী মোদী থেকে বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন, রাজ্য সভাপতি শমীক থেকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু, ভোটের পশ্চিমবঙ্গে মুখে মুখে ফিরছে ‘জয় মা কালী’। ব্রিগেড সমাবেশেও মঞ্চের পটভূমিতে ছিল দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের আদল। ‘সাধারণ হিন্দুত্ব’ নয়, এ রাজ্যে ‘বাঙালি হিন্দুত্ব’ তুলে ধরার সিদ্ধান্তই যে হয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তখনই। কিন্তু সংখ্যালঘু মোর্চা এখনও স্বচ্ছন্দ বোধ করছে ‘জয় শ্রীরামে’-ই। নতুন স্লোগানটা কেন ‘ধর্মীয়’ নয়, কেন সেটিকে শুধু ‘অপশক্তির বিনাশ’-এর প্রতীক হিসাবে দেখা উচিত, সে ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে সংখ্যালঘু সমাজের সামনে তুলে ধরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বিজেপি-র এই শাখা সংগঠনের।

Advertisement
আরও পড়ুন