রানিগঞ্জে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
‘‘নতুন মেশিন গুনবেন। আপনার ভোট পড়ছে কি না দেখবেন। মা-বোনেরা ভোট শেষে পাহারা দেবেন। রুখে দাঁড়াবেন। মাতঙ্গিনীর মতো। বিজেপিতে উত্তর দেবেন।’’ প্রার্থীদের হয়ে ভোটের আবেদন করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘হরেরামকে ভোট দেবেন, কিন্তু অনুরোধ করব, তোমার ছেলেকে বলো লাল বাতির গাড়ি নিয়ে না ঘুরতে। এখন থেকে সতর্ক করলাম। মলয় ঘটক আসানসোল উত্তর, ওকে ভোট দেবেন।’’ তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
‘‘সারা জীবন লড়াই করেছি। করব। আজও বিজেপি চক্রান্ত করো। বাংলাকে টার্গেট করেছো, দিল্লি টার্গেট করেছি আমরা। পারলে সামলে নিয়ো। ভোটের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে বিরক্ত করবে। ছাপ্পা দেওয়ার চেষ্টা করবে। টাকা দিতে চাইবে। টাকায় যে বিক্রি হয়, তার চরিত্র নষ্ট হয়। চরিত্র নষ্ট হলে ফেরে না। আপনার পরিচয় আপনার নীতি। পাপ করলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। ৫০০ টাকা গুঁজে দিয়ে যাচ্ছে। তাতে দিন চলবে? ভ্যানিশ ওয়াশিং কমিশন। বিজেপির আয়না। বাংলা মাথানত করে না। বিজেপি রাজ্যে মাছ, মাংস খাওয়া বন্ধ। এনকাউন্টারের নামে মানুষ মারে। এখানে বাইরে থেকে য়ডুকেছে। সাবধানে থাকবেন। নাকা চেকিং করবেন। আমার অনেক ভিডিয়ো আছে। সময় মতো দেব। প্রথমে বলবে জিতছে। তার পরে বলবে হারবে। আগের দিন রান্না করবেন। ইভিএম মেশিন যত ক্ষণ না যায়, পাহারা দেবেন। ভাইদের পাশে থাকবেন। গণনার দিন পর্যন্ত যাতে হ্যাক করতে না পারে। ’’
‘‘বিজেপির চক্রান্ত করতে হবে ব্যর্থ। তুমি এসআইআর লিস্ট বার না করলে হবে না। মানুষকে ভোটাধিকার দিতে হবে। সব ধর্মকে সম্মান করি। একই পরিবারের এক জনের নাম আছে, চার জনের নেই। এনআরসি করে শিবিরে পাঠিয়ে দেবে। আমি করতে দেব না। প্রতিশ্রুতি করছি। পালন করব। আমার ক্ষমতা কেড়েছো। আমার ক্ষমতা মানুষ। ’’
‘‘ নির্বাচন এলে বলবে দাম কমালাম। শাড়ির দোকানের মতো। ছিল গ্যাসের দাম ৪০০, বাড়িয়ে করেছো ১১০০ টাকা। পেট্রোল কতবার বেড়েছে? রেলের ভাড়া কত বার বেড়েছে? রেল বেচেছে। গেল বেচেছে। দেশটাকে বেচেছে। আমি অঙ্গীকার করি, বাংলায় জিতে দিল্লি যাতে দখল করা যায়! তার জন্য সকলকে নিয়ে মাঠে নামব। ভারতে যত রাজনৈতিক দল আছে। এদের রাখা যাবে না। এরা সর্বনাশী দল। দেখে দেখে বাংলায় এসে বলে সুনার বাংলা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলে বঙ্কিমদা। লজ্জা করে না। সংস্কৃতি জানে না। আমরা বাইরের মনীষী সম্পর্কে না জেনে মন্তব্য করি না।’’
‘‘আজ পর্যন্ত জানাতে পারল না কার নাম আছে, কার নেই। যার নাম নেই ট্রাইবুনালে যেতে হবে। দেশে একটাই রং, বিজেপি খাবে, আর কেউ খাবে না। নোটবন্দিতে কত লাইন দিয়েছেন? লক্ষ্মীর ভান্ডারও জমা দিতে হয়েছে। আধার কার্ড চলবে না। মানুেশর ভোট কাটার জন্য এসআইআর। ওটাই তোমাদের মৃত্যুবাণ। বাংলার সর্বনাশ করতে গিয়ে দেশের ক্ষমতা হারাবে।’’
‘‘ডিভিসিকে জমি দিয়েছি ১০ হাজার একর। চাকরি এখানকার লোক পাবে। বাইরের লোক পাবে না। যারা কয়লাখনি বন্ধ করেছেন, বলব, নিজেরা চালাতে না পারলে আমরা চালাব। অনেকবার চিঠি দিয়েছে, বেনামী খাদান থেকে বিজেপি টাকা রোজগার করে। তৃণমূলকে চোর বলে। সবচেয়ে বড় ডাকাত, স্বৈরাচারী বুলডোজ়ারের দল, ভোটার তালিকায় নাম কাটার দল। এত দিন থাকার পরে প্রমাণ দিতে হবে আপনি নাগরিক কি না! ২২০ জন মারা গেছেয় ভোটবাক্স তাদের আত্মারা পাহারা দেবে। সব চক্রান্ত ব্যর্থ হবে।’’
মমতা জানান যুবসাথী, চাকরির কথা মনে করান। তিনি কটাক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকে। তিনি বলেন, ‘‘দারিদ্র্যসীমার উপরে এক কোটি ৭৫ লক্ষ লোককে তুলে দিয়েছে। জঙ্গলমহলে যাঁরা খেতে পেতেন না, আমরা রেশন দিই। যারা রেশন চায়, সকলে পায়। বিনাপয়সায় স্বাস্থ্য, রেশন। কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দিই যার এক একরের বেশি জমি। ক্ষেতমজুরেরাও পান। যার এক কাঠা জমি তিনিও পান। রাস্তার টাকা বন্ধ। বাড়ির টাকা বন্ধ। যে টাকা বাকি আগামী দিনে সব টাকা দেব। পানীয় জল এক কোটি ঘরে পৌঁছেছে। আগামী দিন সব ঘরে ঘরে পৌঁছে দেব।’’
‘‘আমরা ডেউচা পাঁচামি করছি। আসানসোলে সেল গ্যাস কোম্পানি। ২২ হাজার কোটি বিনিয়োগ হচ্ছে। ইকোনমিক করিডোর হচ্ছে। ডানকুনি থেকে বর্ধমান-বাঁকুড়া হয়ে যাচ্ছে। অনেক শিল্প হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ধুঁকছে। আমি প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়েছিলাম। ইসিএস, বিসিসিএলের কোনও আধুনিকীকরণ হয়নি। আমরা বেঙ্গল প্যাকেজে করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক, সব আমরা করেছি। উর্দু, শিখ, অলচিকি ভাষা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আরও দশটা কাজ করতে হবে।’’ এর পরে ‘প্রতিজ্ঞা’র কথা জানান মমতা। লক্ষ্মীর ভান্ডার, সেল্ফগেল্প গোষ্ঠী, স্বাস্থ্যসাথীর কথা মনে করান তিনি। এর পরে ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ হবে। শিবির হবে।
‘‘বলে আয়ুষ্মান মমতাদি করতে দেননি। কেন করতে দেব? কত লোক পাবে? অর্ধেক টাকা আমরা দেব। আমরা আগেই স্বাস্থ্যসাথী করেছি। পরে আপনারা ভাবলেন। সেই পাকাবাড়ি, স্কুটি, মোবাইল থাকলে পাবেন না। সব ফাঁকা। করছে লুট, বুলছে ঝুট।’’
‘‘বিহারে দেখলেন না মেয়েদের ভোটের আগে আট হাজার টাকা দিল। ব্যবসা করো। তার পরের দিন বুলডোজ়ার। বলছে টাকা ফেরত দাও। মা-বোনেরা এক দিনের জন্য চান নাকি সারা জীবনের জন্য? আপনাদের ঠিক করতে হবে। ওরা বলে, আমরা করব। আমরা বলি, করেছি। লক্ষ্মীর ভান্ডার সকলে পায়। বিজেপির রাজ্যে টুকলি করে একটা-দু’টো জায়গায় করে। ফোন থাকলে পাবেন না। স্কুটি থাকলে পাবেন না। মানে ১০ শতাংশও পাবেন। এখানে বাধা নিষেধ নেই। এখানে আমরা দেখি না কে বাউড়ি, কে বাগদী, কে টুডু। সকলের অধিকার। ’’
‘‘ববি মেয়র থাকলে কী হবে, কমিশন সব নিয়োগ করেছে। শুক্রবার বেহালায় অনেক দোকান ভেঙে দিয়েছে। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। যে দোকান বুল়ডোজ়ার চালিয়ে ভেঙেছে, আমি আবার গড়ে দেব। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। এগুলো আমাদের নির্দেশে হয়নি। এরা সারা জীবন থাকবে না। সকলকে সরিয়ে কখনও বুলডোজা়র চালাচ্ছে, যা ইচ্ছা তাই করছে। আপনারা সমর্থন করেন মা-বোনেরা? আমি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। দুই শয়তান অত্যাচার করেছে। নাম বলার দরকার নেই। এখানে যদি আসবার চেষ্টা করে সকলকে তাড়িয়ে দেবে। বুলডোজ়ার চালাবে।’’
‘‘আমি কেন জগন্নাথ ধাম করেছি। খুব পাপ করেছি। রোজ প্রশ্ন করা হয়। একটাকেও ছাড়ব না, মানুষ বিচার করবে।’’
‘‘একটা কান কাটা থাকলে দুটো কান কাটার ভয় থাকে। এদের (বিজেপি) দুটো কান কাটা। রামনবমীর মিছিল করো আপত্তি নেই। আমাদের ছেলেমেয়েরা করে। হিংসা করে না। আমার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে। উকুন বাছার মতো করছে। নিজেদের লোক নিয়োগ করেছে। ওরা জানে না, যতই বাছো বাংলায় আমরাই থাকব। চাই সকলে কাজ করুক।’’
‘‘এক এক বুথে শুনছি ৫০০ নাম থাকলে ৪০০ বাদ। এটা কি মজা হচ্ছে? কী হচ্ছে? লক্ষ্মণরেখা হয়। বিজেপি সব সীমা পার করছে। প্রথম অতিরিক্ত তালিকা কোথায়? নরেন বলল এক কোটি। আমি বললাম এক কোটি ২০ লক্ষ। প্রথমেই ৫৮ লক্ষ বাদ। খোলাই হয়নি। তার পরে ৬০ লক্ষ লজিস্টিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। তার মানে, একটা মেয়ের বিয়ে হয়েছে, সে পদবি বদলেছে। সে জন্য লজিস্টিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। আমার নামের অনেক বানান লিখতে পারি। আমার নামের বানান কী লিখব, আমার অধিকার। বাবা-মা দিয়েছে। তোমার এআই দিয়ে নাম ভুল করেছো। লজ্জা করে না!’’
‘‘এক দিকে বোলপুরে শান্তিনিকেতন তৈরি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চুরুলিয়ায় জন্মান নজরুল। জানেন, কবি নজরুল কত শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছেন? না জানলে বলব বই খুলে পড়ুন।’’
‘‘রামনবমী আমাদের ছেলেমেয়েরা করে। নবরাত্রি, দুর্গাপুজো, ছটপুজো, কালীপুজো করি। বড়দিন, ইদ পালন করি। সব ধর্ম-বর্ণ মিলিয়ে থাকে। সে শিখ, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, মতুয়া, বাউরি, লোধা, বাগদি, শহর, মুর্মু হোক, সকলকে নিয়ে আমরা চলি। আমার বিরবাহা, টুডু। বাউরি উন্নয়ন বোর্ড, বাগদি উন্নয়ন বোর্ড অনেক করেছি। আমরা চাই, তারা সমাজের উপর অংশে আসুক। কাল মিছিল ছিল। ধর্ম মানে মানবিকতা। একটা আঙুল দিয়ে হাত মুঠো হবে না। বাড়িতে বাবা, মা, ভাই, বৌ, বাচ্চারা থাকতে হয়। সকলকে নিয়ে সমাজ সংস্কার। নেতাজি, যাঁর ডান হাত ছিলেন শাহনওয়াজ খান। তিনি কি ভুল করেন?’’
‘‘যাদের নতুন পোস্টিং হয়েছে, তাদের বলব, আপনারা রাজ্যের প্রশাসনে আছে। যদি কাজ করতে চান ভাল করে, তবে মানুষকে দেখুন, আমাকে দেখার দরকার নেই।’’
‘‘বিজেপি পরিচালিত যে ভ্যানিশ কমিশন রয়েছে, বিজেপির ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন, তারা মানুষের উপর অত্যাচার করার জন্য, যারা এলাকা চিনত, সে রকম ৫০ থেকে ১০০ অফিসারকে কেরল, তামিলনাড়ুতে পাঠিয়ে দিয়েছে। যাতে বিজেপির বেনামী টাকা ঢুকতে পারে। মাদক ঢুকতে পারে। গুন্ডা ঢুকতে পারে। বুলডোজ়ার ঢুকতে পারে। দাঙ্গা করতে পারে। ’’
‘‘আসানসোন নতুন জেলা। আমরা পুলিশ কমিশনারেট তৈরি করেছি। আমরা যেগুলো তৈরি করেছি, আর নতুন করে বলতে চাই না।’’
‘‘আপনাদের বলি, বিজেপির চক্রান্ত আপনারা জানেন। রানিগঞ্জ ধসপ্রবণ এলাকা। ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে ৬০০০ ফ্ল্যাট তৈরি করেছি। আরও ৪০০০ তৈরি করব। মা-ভাই-বোনদের কাছে অনুরোধ, মানুষের জীবন দামি। একটা নয়, ২টি ফ্ল্যাট সরকার দেবে, যদি আপনারা শিফট করেন। শিফিটিংয়ের খরচ দেবে। ১০ লক্ষ টাকা ধরা হয়েছে। তা বাড়লে বাড়বে। আপনারা ভাবুন নতুন করে। যদি ধস নামে, হাজার হাজার মানুষ ধসের নীচে চলে যাবেন, আমরা চাই না। আমি জোর করছি না, আবেদন করছি।’’