রামনবমী উপলক্ষে মিছিলে পাশাপাশি তৃণমূল প্রার্থী নরেশ বাউড়ি (বাঁ দিকে) ও বিজেপির অনুপ সাহা। দুবরাজপুরে। — নিজস্ব চিত্র।
আপাতদৃষ্টিতে অস্ত্র ছিল না। কিন্তু রামনবমীর মিছিল ঘিরে শুক্রবার মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে গোলমালের পরে পুলিশের অনুমান, জনতার একাংশের কাছে লাঠি, ইট ছিল। জঙ্গিপুর ছাড়া, উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের নানা জায়গায় আইনের তোয়াক্কা না করে অস্ত্র উঁচিয়ে মিছিল করতে দেখা গিয়েছে অনেককে। তাতে শামিল হয়েছেন আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থীরা। বাঁকুড়ায় বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আয়োজিত রামনবমীর শোভাযাত্রায় বুলডোজ়ার দেখা গিয়েছে।
জঙ্গিপুরে এ দিন দুপুরে রামনবমীর মিছিল এবং পতাকা টাঙানোকে কেন্দ্র করে অশান্তি বাধে। চলে ইট-বৃষ্টি। বাস, যন্ত্রচালিত ভ্যানে ভাঙচুর হয়। আগুন জ্বেলে রাস্তা বন্ধ করা হয়। লাঠি চালায় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। ডিআইজি (মুর্শিদাবাদ) অজিত সিংহ যাদব বলেন, ‘‘বেশ কিছু লোককে আটক করা হয়েছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। কী থেকে গন্ডগোল লাগল, খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। কয়েক জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।’’ বিজেপির অভিযোগ, পরিকল্পিত ভাবে আক্রমণ করা হয়েছে মিছিলের উপরে। তৃণমূল দাবি করেছে, কেন এমন হল, নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহিকরতে হবে।
এ দিন বহরমপুরেও রামনবমীর মিছিলে অস্ত্র দেখা গিয়েছে। উদ্যোক্তা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং রামনবমী উদ্যাপন সমিতি। বিজেপির বহরমপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি মলয় মহাজন বলেন, ‘‘অস্ত্র নিয়ে মিছিল হচ্ছে, এটা সমাজের জন্য খুব ভাল লক্ষণ।’’ আয়োজকদের তরফে সুকদেব বিশ্বাস বলেন, ‘‘অস্ত্র নিয়ে কারা এসেছেন, জানা নেই।’’ নদিয়ার কৃষ্ণনগরে রামনবমীর মিছিলে পুলিশ ও আধা-সেনার সামনে অনেককে অস্ত্র হাতে হাঁটতে দেখা যায়। মিছিলে আসা জনতার থেকে একটি গদা, দু’টি খড়গ বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। জেলাশাসক শ্রীকান্ত পাল্লি বলেন,“কী ঘটেছে,দেখা হচ্ছে।”
পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলের মিছিলে আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালকে ত্রিশূল হাতে দেখা যায়। নিয়ামতপুরে লাঠি খেলেন কুলটির বিজেপি প্রার্থী অজয় পোদ্দার। অজয় বলেন, “রামনবমীতে লাঠি খেলেছি। যখন সামনাসামনি লড়াই হবে, কোন অস্ত্র ব্যবহার হবে জানি না। অগ্নিমিত্রা বলেন, “ভগবানই শিখিয়েছেন অস্ত্রশস্ত্র রাখা।’’ গদা, তরোয়াল, ভোজালি, ত্রিশূলের মতো অস্ত্র উঁচিয়ে রামনবমীর মিছিল বেরোয় হুগলির চুঁচুড়া, ব্যান্ডেলে। ব্যান্ডেলের মিছিলের সামনে থাকা চুঁচুড়ার বিজেপি প্রার্থী সুবীর নাগ বলেন, ‘‘অস্ত্র হল বীরত্বের প্রতীক। কাউকে ভয় দেখানো হচ্ছে না।’’
চন্দননগরের নগরপাল সুনীলকুমার যাদব বলেন, ‘‘নিষেধ করার পরেও অস্ত্র নিয়ে যাঁরা বেরিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা হবে।’’ হাওড়ার উলুবেড়িয়ার মিছিলে নাবালকদের হাতেও অস্ত্র দেখা গিয়েছে। মিছিলে ছিলেন তিন বিজেপি প্রার্থী— উলুবেড়িয়া উত্তরের চিরণ বেরা, উলুবেড়িয়া দক্ষিণের স্বামী মঙ্গলানন্দ পুরী, উদয়নারায়ণপুরের প্রভাকর পণ্ডিত। উদ্যোক্তাদের দাবি, মিছিলে আসল অস্ত্র ছিল না। নাচের অনুষ্ঠানে প্রয়োজনে কেউ কেউ নকল অস্ত্র নিয়েছিলেন। এগরায় রামনবমীর জমায়েতে বিজেপি প্রার্থী তথা বিদায়ী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ভাই দিব্যেন্দুকেও তরোয়াল হাতেদেখা গিয়েছে।
উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের হাসিমারায় তরোয়াল হাতে রামনবমীর মিছিলে হাঁটতে দেখা যায় কালচিনির তৃণমূল প্রার্থী বীরেন্দ্র বরা ওরাওঁকে। তবে বীরেন্দ্র বলেন, “কেউ আমার হাতে ভুল করে অস্ত্র দিয়েছিল। সরিয়ে দিয়েছি।” শিলিগুড়ির মিছিলে মহিলা, শিশুদের হাতে দেখা গিয়েছে তরোয়াল। জলপাইগুড়ির বেলাকোবার মিছিলে এক মহিলার হাতে দেখা গিয়েছে তরোয়াল। জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমরনাথ কে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে। শোভাযাত্রায় অস্ত্রের ঝলক দেখা গিয়েছে মালদহ, দুই দিনাজপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর, গড়বেতা, বীরভূমের সিউড়িতেও।সন্ধ্যায় উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় অস্ত্র নিয়ে রামনবমীর মিছিল বেরোয়।
বাঁকুড়ায় রামনবমীর শোভাযাত্রায় বুলডোজ়ার থাকায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বুলডোজ়ারে সাঁটানো পোস্টারে লেখা ছিল, ‘অযোধ্যায় ঝলক দেখেছেন। কাশী ও মথুরা এখনও বাকি’। বুলডোজ়ারের ঠিক পিছনেই ছিলেন বাঁকুড়ার বিজেপি প্রার্থী নীলাদ্রিশেখর দানা। তিনি বলেন, ‘‘হিন্দুরা মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করবেন না।’’ তৃণমূলের বাঁকুড়ার সাংসদ অরূপ চক্রবর্তীর টিপ্পনী, ‘‘রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি গরিবের উপরে বুলডোজ়ার চালাবে।’’