বেহালায় সিপিএমের জনসভা। মঙ্গলবার — নিজস্ব চিত্র।
তখনও ভোট ঘোষণা হয়নি। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ করেছিল সিপিএম। যে সব এলাকায় বামেদের জমি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, মূলত সেই সব অঞ্চল দিয়ে গিয়েছিল মূল মিছিল। আর বাকি এলাকায় ছিল উপ-যাত্রা। সেই ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’য় সাড়া মিলেছিল ভালই। তবে ফের চর্চা হয়েছিল, সিপিএমের সভা-মিছিলে ভিড় হয় কিন্তু বাক্সে ভোট পড়ে না! এ বার রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় বামেদের নির্বাচনী প্রচারে ভিড়ের চেহারা নতুন করে চর্চার কারণ হচ্ছে!
রাজ্যে কিছু আসন আলাদা করে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে লড়তে নেমেছে সিপিএম। কিছু আসনে আইএসএফের সঙ্গে সমঝোতা বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। প্রচার-পর্বে দেখা যাচ্ছে, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কলতান দাশগুপ্ত, দীপ্সিতা ধরেরা আগের মতোই ময়দানে চোখে পড়ছেন। কিছুটা নতুন আকর্ষণ নিয়ে এসেছেন বালিগঞ্জের নবীন প্রার্থী আফরিন বেগম (শিল্পী)। কিন্তু তার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় অন্যান্য প্রার্থীদের জনসংযোগেও সাড়া মিলছে ভাল। শিলিগুড়ির সিপিএম প্রার্থী শরদিন্দু চক্রবর্তীর শেষ লগ্নের মিছিল যেমন বামেদের উৎসাহ বাড়িয়েছে। নকশালবাড়ি, জলপাইগু়ড়ি বা ধূপগুড়ির এক একটা মিছিলেও অন্য রকম ছবি দেখা গিয়েছে, যা সাম্প্রতিক কালে হয়নি। মুর্শিদাবাদের ডোমকলে মুস্তাফিজুর রহমান (রানা), জলঙ্গিতে ইউনুস সরকার বা রানিনগরে জামাল হোসেনেরা ধারাবাহিক ভাবে ভাল লোক টানছেন। তবে সব চেয়ে বেশি নজর টেনে নিয়েছেন করণদিঘির মহম্মদ সাহাবুদ্দিন! বাম শরিক ফরওয়ার্ড ব্লকের হাত থেকে নিয়ে উত্তর দিনাজপুরের ওই আসনে এ বার লড়ছে সিপিএম। প্রার্থী সাহাবুদ্দিনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার মিছিল বা দলের রাজ্য সম্পাদক মহন্মদ সেলিমকে নিয়ে সমাবেশে ভিড় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল। প্রচারের শেষ দিনে, মঙ্গলবার তাঁর সমর্থনে বাইক মিছিলও একই কারণে চর্চায় আসছে।
প্রচারে এই সাড়া কি শেষ পর্যন্ত শূন্যের গেরো কাটাতে সাহায্য করবে সিপিএমকে? দলের বর্ষীয়ান নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘তৃণমূলকে হারানোর তাগিদে গত কয়েকটি নির্বাচনে বাম কর্মী-সমর্থকদের একাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়ে দিয়েছেন। এ বার সেই জিনিস আর হবে না। পাড়ায়, ওয়ার্ডে বাম কর্মী-সমর্থকেরা এ বার অনেক বেশি আন্তরিক ভাবে ময়দানে নেমেছেন। আমাদের দেখে মূলত গরিব মানুষ এগিয়ে আসছেন।’’ তাঁর দাবি, তৃণমূলের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা আছে, তেমনই বিজেপির ‘মোহ’ও কাটতে শুরু করছে।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিমের বক্তব্য, শুধু দলের আসন বলে নয়, বামপন্থার পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে এ বারের লড়াই। কলকাতা প্রেস ক্লাবের আয়োজনে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তাঁর আরও সংযোজন, ‘‘বিজেপি-তৃণমূল, উভয়ই চেষ্টা করেছে ধর্মের নামে ভোট করাতে। কিন্তু সিপিএমের ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ প্রমাণ করেছে, মানুষের দাবি রুটি, রুজি। তৃণমূল-বিজেপি এখন বামপন্থীদের চাপে বাধ্য হয়েছে রুটি-রুজির কথা বলতে!’’ তৃণমূলের পাশাপাশিই বিজেপিকে দুষে সেলিমের অভিযোগ, ‘‘এই লড়াই বাংলার মানুষের লড়াই। যারা ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দিয়েছে, নির্বাচনে রাজ্যের মানুষ তাদের জবাব দেবেন।’’ ইসলামপুরে দলীয় কর্মী খুনের ঘটনার প্রসঙ্গেও কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনকে নিশানা করেছেন সেলিম।
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তৃণমূল ও বিজেপি, দু’দলের নেতৃত্বই আবেদন জানাচ্ছেন বামেদের ভোট না দেওয়ার। সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের মতে, সংখ্যালঘু সব এলাকায় পাঁচ বছর আগের মতো শাসক দলের পক্ষে একচেটিয়া সমর্থন থাকবে না। সেখান থেকে বাম, আইএসএফ ও কংগ্রেসের দিকে কিছু সমর্থন যাবে। আর হিন্দু মধ্যবিত্ত এলাকায় পুরনো সমর্থনের কিছুটা ফিরে পেতে পারে বামেরা। তাতে তৃণমূল-বিজেপির শিরঃপীড়া বাড়বে বলেই বাম নেতৃত্বের দাবি।