—প্রতীকী চিত্র।
রোগা হাতে ঢলঢল করছে শাঁখা-পলা। মলিন শাড়ি। গ্রামের রাস্তায় ছুটছে মেয়েটা। পিছনে দৌড়চ্ছে এক শিশু। ভাই-বোন?
নাহ্। মা-ছেলে। মা ১৭। ছেলে বছর তিনেক।
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি। পড়ন্ত বিকেলের এই দৃশ্য বুঝিয়ে দিল, ওই কিশোরী ছুটছে। কিন্তু তারগন্তব্য নেই।
এ রাজ্যের জেলায় জেলায় বাড়ছে নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যে প্রতি বছর যত প্রসব হয়, তার মধ্যে ১৫ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের কম। সংখ্যার বিচারে বছরে এক লক্ষ ৮০ হাজার থেকে এক লক্ষ ৯০ হাজার। বছরে যত প্রসূতির মৃত্যু হয় তারও ১৫ শতাংশ নাবালিকা। সেখানে সংখ্যাটা ১১০ থেকে ১১৫। উদ্বেগ বাড়িয়ে এই মুহূর্তে রাজ্যে প্রসূতি মৃত্যুর অনুপাত অর্থাৎ মেটারনাল মর্টালিটি রেশিয়ো (এমএমআর) ১৪০। প্রতি এক লক্ষ জীবিত সন্তান প্রসবের নিরিখে এই হিসেব ধরা হয়। বিশ্বে ২০৩০ সালের মধ্যে এমএমআর-এর লক্ষ্যমাত্রা ৭০ বা তার কম নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
এ রাজ্য সেই লক্ষ্যে কবে পৌঁছবে কিংবা সে নিয়ে কী কী ভাবনাচিন্তা রয়েছে সে ব্যাপারে কথাই বলতে চান না রাজ্যের স্বাস্থ্য বা নারী-সমাজকল্যাণ দফতরের কর্তারা। প্রায় একই সুরে তাঁদের উত্তর, “চেষ্টা তো চলছে। কিন্তু এটা সামাজিক সমস্যা। তাই রাস্তা অনেক লম্বা।”
কতটা লম্বা তার কিছুটা আঁচ পাওয়া গেল দক্ষিণ কাঁথির এক বাড়িতে। সেখানে এক পরিবারে নাবালিকার বিয়ে হয়েছে। সন্তানের জন্মও দিয়েছে একরত্তি মেয়ে। কেন? মেয়েটির বাবা ফোনে বলেন, ‘‘ভাল সম্বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। দেরি করলে হাতছাড়া হতে পারত।’’ আর সন্তান ধারণ? মেয়ের মুখে কথা নেই। শ্বশুরবাড়ির দাওয়ায় বসে তার শাশুড়ি বলেন, “বিয়ে হয়েছে। বাচ্চা বিয়োবে না! প্রথম বারটায় মেয়ে হল। ছেলে কখন হবে দেখা যাক।” কিশোরীর বয়স এখন ১৭। পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে তাকে এখনও কতটা পথ যেতে হবে কেউ জানে না!
শুধু কাঁথি মহকুমা হাসপাতালেই মাসে ১২ থেকে ১৩ জন অন্তঃসত্ত্বা নাবালিকা ভর্তি হয়। হাসপাতালের সুপার অরূপরতন করণ জানালেন, একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে, প্রসবের জন্যই সেখানে আসে তারা। তাঁরা নিয়মমাফিক পুলিশকে জানান। কিন্তু তখন এতটাই দেরি হয়ে যায় যে প্রসবের ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকে না।
এই মেয়েরা প্রাথমিক পর্যায়ে সাব সেন্টার বা ওয়েলনেস ক্লিনিকে দেখিয়ে আসে। তার পর ঝুঁকি থাকলে পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ হাসপাতালে যায়। আর জেলা বা মহকুমা হাসপাতালে, কিংবা মেডিক্যাল কলেজে আসে প্রসবের জন্য। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা নাবালিকা এলে সাব সেন্টার স্তরেই তো পুলিশ এবং চাইল্ডলাইনকে জানানোর কথা। সেটা সব ক্ষেত্রে হয় না কেন? জেলার এক পুলিশকর্তা বলেন, “তাতে পকসো কেসে সংশ্লিষ্ট ছেলেটিকে গ্রেফতার করতে হয়। তা করলে থানার সামনে বিক্ষোভের ভয় থাকে। তাই বহু ক্ষেত্রে পুলিশ সেই ঝামেলায় জড়ায় না। তার উপরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ। এই ধরনের গ্রেফতারি এলাকায় অসন্তোষ তৈরি করবে, তাই নেতারাও বিষয়টি চাপা দিতে চান।” স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী বলেন, “ভোটের আগে এক জন নেতার মুখেও এ নিয়ে প্রতিশ্রুতি শুনবেন না। কারণ, তাঁরা অনেকেই এতে মদত দেন।”
আগে আশাকর্মীরা এই সব ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরে জানতে পেরে পুলিশকে খবর দিতেন। কিন্তু মারধরের ও কাজ কেড়ে নেওয়ার হুমকি শুনে শুনে তাঁরাও তিতিবিরক্ত। মারিশদার কাছে এক সাব সেন্টারের এক আশা কর্মীর কথায়, “পঞ্চায়েতের মাথারাও আমাদের শাসায়। বলে, ‘কে বিয়ে করল, কার বাচ্চা হল, তাতে তোমাদের কী? নালিশ করলে বিপদে পড়বে।’ ঝামেলায় জড়াব কেন বলুন তো?”
নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অসিত দেওয়ান বলেন, “প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লেও কিছু করার থাকে না। গর্ভপাত করাতে রাজি থাকে না অধিকাংশ পরিবার। এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে এমন প্রতিরোধ তৈরি হয় যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় পঞ্চায়েতও এর সঙ্গে জুড়ে যায়।”
তা হলে যে প্রশাসনিক স্তর থেকে ‘চেষ্টা চালানো’-র কথা বলা হয়, সে কি কথার কথা? শুধু অল্প বয়সে বিয়ের কারণেই নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা বাড়ছে তা নয়। একটা বড় অংশ এমনও আছে যেখানে ভয় দেখিয়ে বা অপহরণ করে যৌন নির্যাতন করা হয়। তার জেরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে মেয়েরা। আবার স্বেচ্ছায় কারও সঙ্গে বেরিয়ে, পরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করে অনেক নাবালিকা। অভিযোগ, জানাজানি হলে বহু ক্ষেত্রে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। আপসে মিটিয়ে নেওয়ার ‘পরামর্শ’। তাতে কোনও ভাবেই কাজ না হলে থানা অভিযোগ নেয়। আদালত। হোম। বহু ক্ষেত্রে এ সব হতে হতে এতটা সময় পেরিয়ে যায় যে ‘মেডিক্যাল টার্মিনেশন অব প্রেগন্যান্সি’-রসময় থাকে না।
পরিস্থিতি কতটা সঙ্গিন তার একটা নজির পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর-২ ব্লকের পাঁউসির একটি হোমে। শুধু সেখানেই প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ জন অন্তঃসত্ত্বা নাবালিকা আসে। সেখানেই দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। ১৫ বছর বয়সেই সে জীবনের কঠিন যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে। যৌন নিগ্রহের শিকার হয়ে ১২ বছরে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল ওই কিশোরী। তার পর ওই হোমে। সেটা ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস। তত দিনে অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। তাই গর্ভপাতের অনুমতি পাওয়া যায়নি। হাই কোর্টে আবেদন করা হয়। হাই কোর্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনুমোদন দিলে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে গর্ভপাতের ব্যবস্থা হয়। তত দিনে ছয় মাস পেরিয়ে গিয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চলেছিল তার।
তার পর বেঁচে হোমে ফিরল মেয়েটা। শুধু শরীরে নয়, মনেও পুনর্জন্ম। দীর্ঘ কাউন্সেলিং পেরিয়ে নতুন জীবন। এখন বয়স ১৫। নবম শ্রেণীর ছাত্রী। হোমের আধিকারিকরা জানালেন, নাচ, গান, যোগাসন সবেতেই সে দক্ষ। চলছে ক্যারাটে প্রশিক্ষণও।
ছিপছিপে চেহারায় ভরপুর আত্মবিশ্বাস। মেয়েটি বলে, “এখানে সামনে যাদের পাই, তাদের সঙ্গে তো কথা বলিই, আমার লক্ষ্য, আরেকটু বড় হয়ে এই হোমের বাইরেও অন্য মেয়েদের সচেতন করব।” কী বিষয়ে সচেতন করবে? সে বলে, “কম বয়সে বাচ্চা হওয়া আটকাতেই হবে। সে বিয়ে করে বাচ্চাই হোক বা কারও অত্যাচারে আমার মতো অন্তঃসত্ত্বা হওয়াই হোক। থানায় যেতে হবে। আরও উপরের স্তরে যেতে হবে। অন্যায়টা মেয়েদের চুপচাপ মেনে নেওয়া চলবে না।”
১৫ বছরের তুলনায় কথাগুলো অনেক বেশি প্রাপ্তবয়স্ক শোনাচ্ছে? উপায় কী? সে মেয়ে নিজেই বলে, “আমি আর ছোট থাকার সুযোগ পেলাম কই? তবে যত ধাক্কাই আসুক, সব কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছি। অনেকেই সেটা পায় না। যারা পায় না, আমি তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’’
এক কিশোরীর এমন মনোবল থেকে প্রশাসন কি শিক্ষা নেবে?
(চলবে)