স্ত্রী পদবিকে এখানে খুন করা হয়েছিল, দেখাচ্ছেন সুভাষ। ছবি: সঙ্গীত নাগ।
বাড়ির দাওয়ার এক কোণে এখনও জমাট বাঁধা রক্তের দাগ। চারপাশটা দড়ি দিয়ে ঘেরা ছিল ঘটনার পরে। সেই দড়ি আর খোলা হয়নি। দড়ি টপকে ভিতরে ঢুকে পদবি টুডুর স্বামী সুভাষ দেখাচ্ছিলেন, ঠিক কোন জায়গায় ১০ জন মিলে চেপে ধরে শাবল দিয়ে থেঁতলে মারা হয়েছিল তাঁর স্ত্রীকে। ‘ডাইনি অপবাদে’!
গ্রামের একমাত্র ‘শিক্ষিত’, ৩৭ বছরের পদবি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছিলেন। ইংরেজি পড়তে পারতেন। দুই ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর উৎসাহ প্রবল। গ্রামের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতেন। পরিবারেও স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির ভরসা। এমন ‘ডাইনি’-কে তাই শেষ করে ফেলার সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল আত্মীয়দের একাংশের মধ্যে। সময় লেগেছিল মাত্র ১৫ মিনিট। গত কালীপুজোর ভরসন্ধ্যায় যখন এই ঘটনা ঘটছে, তখন প্রতিবেশীরা যে যাঁর বাড়িতেই। কিন্তু মাকে বাঁচানোর জন্য মেয়ের আর্তি তাঁরা কানে তোলেননি। এক জনও বেরোননি ঘর থেকে। কারণ, পদবি ‘সব ব্যাপারে কথা বলে’। তাই হতেই পারে যে ‘পদবি ডাইনি’।
রাজ্য জুড়ে উন্নয়ন, শিক্ষা ও ডিজিটাল অগ্রগতির দাবির মধ্যে এই মৃত্যু একটা সপাটে চড়।
পুরুলিয়ার পাড়া ব্লকের চাপুড়ি গ্রাম। টালির চালের ঘর। শুধু দারিদ্র নয়, ঘর জুড়ে বিষণ্ণতার গন্ধ। একটা মৃত্যু গোটা পরিবারকেই ছন্নছাড়া করে দিয়েছে। দিনমজুর সুভাষ এখন অনেক দিনই কাজে বেরোতে পারেন না। কারণ, তাঁর ৬ বছরের ছেলে জানে না, মা নেই। সে জানে মা হাসপাতালে। ছেলের দেখাশোনা এখন সুভাষই করেন। আর তাঁর মেয়ে এখন থাকে সরকারি হস্টেলে।
কেন? কারণ, ডাইনি অপবাদে খুনের ঘটনায় দু’জন পলাতক। আর যে আট জন গ্রেফতার হয়েছিল, তার মধ্যে সাত জনই এখন জামিনে মুক্ত।
অভিযোগ, জেল থেকে বেরিয়েই তারা সদর্পে ঘোষণা করেছে এই পরিবারকে শেষ করে দেবে। সবার আগে শেষ করবে তাকে, যার জন্য তারা জেল খেটেছে। সে কে? পদবি-সুভাষের ১৫ বছরের মেয়ে। আদালতে দাঁড়িয়ে সে-ই জানিয়েছিল সেই সন্ধ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। চিহ্নিত করছিল অপরাধীদের।
তাই ‘মেয়ে মায়ের মতো। ওকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না’— এমনটাই নিদান।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ডাইনি সন্দেহে নির্যাতনের ঘটনা সাধারণত গ্রামীণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় বেশি ঘটে। কুসংস্কারের বশে অসুস্থতা, হঠাৎ মৃত্যু, গবাদি পশুর রোগ বা পারিবারিক বিবাদের মতো ঘটনাকে ঘিরে অনেক সময় কোনও মহিলাকে ‘ডাইনি’ বলে নিদান দেওয়া হয়। আবার কাউকে ভয় পেলে, তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার অস্ত্রও এই অপবাদ। প্রশাসনের ভূমিকা?
পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভরসন্ধ্যায় বাড়িতে ঢুকে থেঁতলে মারা হচ্ছে এক জনকে। এই সাহস লোকে পায় কোথা থেকে? আসলে প্রশাসনের যে ভূমিকা নেওয়ার কথা, অনেক সময়েই তারা সেটা নেয় না। তাই ২০২৬ সালেও আমাদের ডাইনি প্রথা নিয়ে কথা বলতে হয়।’’ তিনি এ-ও বলেন, “অসম, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের মতো কয়েকটি রাজ্যে ডাইনি নির্যাতন রোধে বিশেষ আইন রয়েছে। এ রাজ্যে নেই। তাই ডাইনি অপবাদে কারও উপর নির্যাতন চললে পুলিশ সাধারণ হামলার ধারাতেই কেস দেয়। বড় সমস্যা সেটাও।”
এখনও যে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাইনি অপবাদে নির্যাতনের খবর আসে, সেখানে এ নিয়ে সচেতনতার কর্মসূচি কতটা? জেলা প্রশাসনের কাছে এর উত্তর নেই।
সুভাষ নিয়ে যান তাঁর বাবা বীরেশ্বর টুডুর কাছে। এখন আর ঘর ছেড়ে বেরোন না তিনি। কারণ, সব কিছুতেই ‘ঘেন্না হয়’ তাঁর। ঘরের বাইরে একটা শূন্য খাঁচা। বৌমা মারা যাওয়ার দু’দিন পরেই সেই খাঁচার ময়নাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। বললেন, “আমার মাকে মেরো না— বলতে বলতে হাউহাউ করে কাঁদছিল আমার নাতনি। ওরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল বৌমাকে। আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিল। আমার ছোটবেলায় এ সব দেখতাম। শেষ বয়সে এসেও যে দেখতে হবে, ভাবিনি।” বীরেশ্বরের পাশে বসে কাঁদতে থাকেন তাঁর স্ত্রীও।
পাড়া ব্লকের সরকারি হস্টেলে পদবির মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে কিন্তু এক ফোঁটা চোখের জলও নজরে আসেনি। অথচ সে জানে, তার জীবনের ঝুঁকি আছে। সে জানে, তার পরিবার এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। রোগা-পাতলা মেয়েটা মাথা তুলে বলে, “ভয় পেলে মাকে যারা মারল, তাদের শাস্তি হবে কী করে? জামিন পেয়েছে, পুরোপুরি ছাড়া তো পায়নি। এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি।”
সরকারি হস্টেলে একটু একটু করে মানিয়ে নিচ্ছে ওই মেধাবী কিশোরী। “আমি বিশ্বাস করি ডাইনি বলে কিছু হয় না। কিন্তু এটা আমি একা বুঝলে হবে না। বাকিদেরও বুঝতে হবে। আমার মা বুঝত। মাকে ওরা বাঁচতে দিল না। আমি কিন্তু বাঁচব।” হাতের মুঠো শক্ত হয় তার। হস্টেলের বাকি মেয়েরা একে একে পাশে এসে দাঁড়ায়। ঘিরে থাকে।
যে স্কুলের সে ছাত্রী, সেখানকার প্রধান শিক্ষিকা সুস্মিতা ঘোষবলেন, “আমরা মেয়েটিকে সব রকম ভাবে আগলে রাখার চেষ্টা করছি। ওর মনের জোর মুগ্ধ হওয়ার মতো। এত কিছুর পরেও দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ভাল ফুটবল খেলে। আপাত শান্ত মেয়েটা যখন বলে লাথি মারে, জেদটাফুটে ওঠে।”
বেলা বাড়ে। হস্টেল থেকে বেরিয়ে একের পর এক গ্রাম পেরোনো। মনে পড়ে, পদবির মেয়ে বলছিল, “রাতের রুটি করছিল মা। সেখান থেকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে মাকে যখন ওরা কোপাচ্ছিল, মা বলেছিল আমাকে মারলেই কি সব শেষ হয়ে যাবে? ওরা মাকে কথাটা শেষ করতে দেয়নি। মা ঠিকই বলেছিল। মা নেই, আমি আছি।”
(চলবে)