ছোটগল্প
Bengali Literature

কুকুরের পেট

সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি-পাজামা পরে, বাহারি ছড়ি হাতে গড়াই-বাড়ির পেল্লাই সদরদরজা পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক।

শান্তনু দে
শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৯
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

গরমকালের বিকেলগুলো অনেক বেশি লম্বা। আলো পড়তেই চায় না। এই মফস্সল শহরে এখন ব্যস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ব্যস্ত মানুষদের জন্য বিকেল নয়। তারা কি সকাল, কি দুপুর, কি রাত, সব সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে। তারা কেজো মানুষ। হাসে না। সব সময় তাদের বেজার মুখ। ঘামাচির মতো চিড়বিড় করছে বিরক্তিতে। রাস্তায় একটু জ্যাম হলে তাদের বিরক্তি, দোকানদার মাল দিতে দেরি করলে বিরক্তি। বললেই বলবে, ট্রেন ধরার তাড়া। কত লোক কলকাতার ডেলিপ্যাসেঞ্জার। ট্রেনেই তাদের সকাল-সন্ধে কাটে। এই শহরের বিকেল কেমন হয় তারা জানে না। এ রকম হাজার হাজার মানুষ আছে, যারা বিকেল চেনে না। শহরটাকেই চেনে না ভাল করে। কোন দোকানে মাংসের চপ, ঢাকাই পরোটা, হিঙের কচুরি সেরা, বলতেই পারবে না। রানিকুঠি কোথায়? নীলের মাঠ কোন পাড়ায়? জানেই না। আসলে ওদের তো বিকেল নেই। বিকেলের আলোয় শহর ঘুরতে বেরোয় না ওরা।

পুরনো শহরের মেজাজটা লুকিয়ে আছে এখনও কিছু পাড়ায়। সেখানে পুরনো বাড়ির সামনে আড্ডা, তাস খেলা, গানের আসর, কবিতাপাঠের আসর, নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত শহরের পাঁজরবন্দি হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করে চলছে। থেমে যায়নি।

সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি-পাজামা পরে, বাহারি ছড়ি হাতে গড়াই-বাড়ির পেল্লাই সদরদরজা পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন এক ভদ্রলোক। তিনি মোটেও ব্যস্ত নন। স্থূল চেহারা, গায়ের রং ফর্সা, দেখে বোঝা যায় উনি এই টাউনের এক জন বনেদি বড়লোক। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চেনা রিকশা খুঁজতে লাগলেন। চেনা রিকশায় চড়ে প্রতিদিন বিকেলে শহর ঘুরতে বেরোন তিনি। আজ সেই রিকশাওয়ালা আসেনি। সামনের চায়ের দোকান। রাস্তা পেরিয়ে চায়ের দোকানে গেলেন তিনি।

দোকানি তাঁকে দেখেই বলল, “আসেনি তো, দেখুন কুতায় খেয়ে উল্টে পড়ে আচে। যতো মাতালগুলোকে জোটান আপনি।”

তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, “একটা চা দে। আর বিস্কুট নিলাম।”

বিস্কুট অবশ্য নিজের জন্য নিলেন না। তাঁকে দেখামাত্র রাস্তার কুকুরগুলো লেজ নাড়তে নাড়তে কাছে এসেছে। বয়াম থেকে বিস্কুট বার করে ওদের দিকে ছুড়ে দিয়ে দোকানিকে বললেন, “চারটে লেড়ো নিলাম, লিখে রাখিস।”

দোকানি কালু চা দিয়ে বলল, “আজ আর রিকশায় যেতে হবে না। টোটো ধরে ঘুরে আসুন।”

তিনি বললেন, “টোটো কি ভদ্রলোকে চড়তে পারে! গাদিয়ে লোক নিয়ে হুড়মুড়িয়ে ছোটে, দূর! বিকেলবেলাটাই মাটি।”

“তা হলে আর কী, হেঁটে যান, শরীরের পক্ষেও ভাল।”

“হাঁটার কি জো আছে, চার দিকে লোক গিজগিজ করছে, দু’পা হাঁটলে উল্টো দিকের লোকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। গড়াই বাড়ির ছেলেদের ও-সব মানায় না।”

অনেক তর্কাতর্কির পর ঠিক হল, যত দিন না চেনা রিকশাওলা আসে, তত দিন একটা টোটো নিয়ে ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে, তবে সে অন্য প্যাসেঞ্জার তুলতে পারবে না। তেমন একটা টোটো পাওয়া গেল। এখন রাস্তায় টোটোর অভাব নেই।

অল্পবয়সি টোটোচালক বলল, “কোথায় যাবেন?”

তিনি বললেন, “একটু ঘুরতে যাব। রাজবাড়ি, ঘাটের ধার... যে দিকে মন হয় চলো।”

“দুটো কিন্তু দু’দিকে, যে কোনও একটা বলুন।”

“আরে জানি রে বাবা! আমি গড়াই-বাড়ির ছেলে, সাতপুরুষের বাস এখানে, দুলাল গড়াই বললে টাউনের সবাই একডাকে চিনবে, চলো যে দিকে খুশি।”

টোটোচালক বলল, “একা গেলে কিন্তু একশো টাকা লাগবে।”

“একশো! মগের মুলুক নাকি! এমনিতে দশ টাকা ভাড়া।”

“দশ নয় কুড়ি, সে অনেক প্যাসেঞ্জার হলে। তা ছাড়া আপনি কোথায় যাবেন, বলছেন না। আমরা ঘণ্টা-চুক্তিতে তিনশো করে নিই, আপনাকে তো কমই বললাম। আচ্ছা আপনি আশি দেবেন…”

“আশি কম হল? ঠিক আছে, পঞ্চাশ দেব।”

“তবে কিন্তু লোক তুলব, একা গেলে আশি টাকাই লাগবে।”

“না, আশি না, বলেছি যখন আর দশ বেশি দেব।”

“ঠিক আছে তা-ই দেবেন! অত দরাদরি করেন কেন ভদ্রলোক হয়ে…”

দুলাল গড়াই এ বার ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’তে নেবে এলেন, “দেখ! বড় বড় কথা বলিস না! ন্যায্য ভাড়া নিলে কোনও কথা আসে না। সাত পুরুষের বাস আমাদের... ইটভাটা, লরি... এই মস্ত লাল বাড়িটা আমাদের… বাড়িতে ঠাকুর-চাকর গিজগিজ করছে...আমার ভাই-বোন সব বিদেশে থাকে… বাড়িতে তিন-তিনটে প্রাইভেট গাড়ি…”

“তা সেগুলো না চেপে টোটো?”

“এমনি, ইচ্ছে হল! গাড়ি চড়ে চড়ে বাত ধরে গেল, হাঁটা হয় না, তাই ফেরার সময় হাঁটব ভাবছি…”

“আপনি হাঁটেন না?”

“না, তেমন হাঁটা হয় কই... গাড়িতে করে সব, বাড়িতে অবশ্য হাঁটার যন্ত্র আছে। তাতে চড়ি মাঝে মাঝে। ঘি-দুধ খাওয়া চেহারা তো, হাঁটার ধকল সয় না।”

“আপনাকে কখনও গাড়ি চড়তে দেখি না তো! আমি দেখেছি, বিকেলবেলা রিকশা নিয়ে বেরোন…”

“না না, বিকেলে গাড়ি চড়ি না। হাওয়া খেতে রিকশাই ভাল, আস্তে আস্তে যাবে, ফুরফুর করে হাওয়া আসবে, দেখতে দেখতে যাই, তবে পিছনে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসে, যদি রিকশা বিগড়োয়… ব্যাটা আবার দু’দিন হল ছুটি নিয়েছে। অগত্যা…”

“বলছেন তো সাত পুরুষের বাস, বয়সও তো হল প্রায় ষাটের কাছাকাছি, তা রোজ-রোজ বিকেলে বেরিয়ে কী দেখেন?”

“সে তুই কী বুঝবি! সেই আগের শহরটাকে তো দেখিসনি, এখনকার মতো পেল্লায় ফ্ল্যাটবাড়ি ছিল না, সব একই রকম, পায়রার খোপ, আমি বলি আধুনিক কালের বস্তিবাড়ি। তখন এক-একটা বাড়ি ছিল এক-এক ধাঁচের… বাড়ির সামনে বসার রোয়াক ছিল, বাড়িতে উঠোন ছিল, আম নারকেল শিউলি কাঠচাঁপা ফুলের গাছ… পাশ দিয়ে যেতে গন্ধে মন ভরে উঠত। এখনও কিছু-কিছু আছে। বড় রাস্তার ধারে নেই, সেখানে হালফ্যাশনের বাড়ি আর ফ্ল্যাটবাড়ি। আছে পাড়ার ভিতরের দিকে, সেখানে গাড়ি ঢোকে না, রিকশা ছাড়া গতি নেই। আমার তো সারা দিন এখন বাড়িতে, বিকেলবেলা নিয়ম করে ঘুরি, আমার বাঁচার রসদ পাই।”

“আপনাকে আমি রোজ বাজারে যেতে দেখি। পুঁইশাক কিনে ব্যাগ বোঝাই করে হাঁটতে হাঁটতে ফেরেন।”

“কী যা-তা বলছিস! বাজার কোথায় তা-ই জানি না, আরে গড়াই-বাড়ির ছেলে আমি! ঠাকুর-চাকরের মেলা যে বাড়িতে… হয়তো এক দিন শখ করে বাজার গেছিলাম, খেয়াল করিসনি, পিছনে সব চাকরবাকরের লাইন ছিল...”

“তা হবে, তবে আপনার মতো কাউকে দেখি হয়তো।”

“আমার মতো, আমি নয়। আরে আমরা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছি রে, তোদের মতো হাঘরে ছেলেরা কী করে বুঝবে!”

“সে তো বটেই, কত বড়লোক আপনারা। আপনাদের বাড়ি-গাড়ি-চাকর, আপনারা বিকেলে হাওয়া খেতে বেরোন… আর আমরা দুটো পয়সার জন্য…”

“এটাই তো ভুল করিস তোরা, টাকাপয়সা থাকলেই হল না। টাকাপয়সা তো চোর-ডাকাত-মস্তানদেরও থাকে, আসল কথা হল রক্ত, বনেদি রক্ত…”

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। রাস্তার আলো জ্বালানো হয়েছে, আকাশের নীল রং বদলে ধূসর থেকে কালো হচ্ছে। তারা ফুটছে একটা একটা করে। চাঁদ ওঠেনি এখনও। এটা কৃষ্ণপক্ষ চলছে। সামনে রাজবাড়ির বিশাল সিংহদুয়ার। চার পাশে পরিখা। নাটমন্দির।

টোটোচালক বলল, “রাজবাড়ি এসে গেল, নামবেন না? হাঁটবেন না?”

“না না, রাজবাড়ি আর কী দেখব, সব তো ভেঙে পড়ছে, ছোটবেলায় ঠাকুরদার সঙ্গে আসতাম। তখন নাটমন্দিরে ঝাড়বাতি ঝুলত। এখন বংশধরেরা সে-সব বেচে খেয়েছে। রাজবাড়িতে যা আছে, তার চেয়ে বেশি আমাদের আছে… আর দেখলাম তো কম না। এখন তো টাউনে লোক গিজগিজ করছে, একটা সময় এই রাজবাড়ি থেকে ঘাটের ধারের পুরনো পাড়াগুলো ছাড়া সব ফাঁকা, শেয়াল ডাকত। আমরা কয়েকটা বনেদি ঘর ছড়ি ঘুরিয়ে এসেছি, দেশভাগের পর রিফিউজিরা এসে জঙ্গল কেটে পুকুর বুজিয়ে রয়ে গেল। রক্তবীজের মতো এই শহরটাকে ভরিয়ে ফেলল। তার পর দেখলাম, খাদ্য আন্দোলন, দাঙ্গা, নকশাল আর পুলিশের দাপাদাপি… কত ঝড় গেছে। সব বদলে গেল। এখন সব ছোটলোকের হাতে পয়সা এসেছে। করে খাচ্ছে। কিন্তু বনেদি রক্ত পাবে কোথায়?…”

“বুঝেছি। আপনি হলেন এই টাউনের ইতিহাস বই!”

“তা বলতে পারিস। এই শহরের ইতিহাস যদি লেখা হয়, গড়াই-বাড়ির নাম থাকবেই। যখন দেশভাগ হল, কত মানুষ এল! আমাদের বাড়ির নীচতলার রোয়াক, গুদামঘর বাবা খুলে দিলেন। কত লোক মাথা গোঁজার ঠাঁই পেল। তারও আগে মন্বন্তর, একটু ভাতের জন্য হাহাকার, মা শুনেছি ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে দিত… গড়াই-বাড়ির বনেদি রক্ত... ছোটলোকেরা তার কী বুঝবে বল…”

“কিন্তু আর কত ঘুরবেন, আমার অন্য ভাড়া ধরতে হবে তো!”

“এই সামনে ওই বাড়িটায় যাব আর আসব। তুই ভাবিস না, তোকে পুষিয়ে দেব।”

“পুষিয়ে যে কত দেবেন, আমার জানা আছে!”

“কী বললি! জানিস আমি গড়াই-বাড়ির ছেলে, হেগে টাকা দিয়ে মুছি...”

আর কোনও কথা বলল না টোটোচালক। একটা বাড়ির সামনে দুলাল গড়াই থামতে বললেন।

“ঠিক আছে যান, তাড়াতাড়ি ঘুরে আসুন। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এর পর ভাড়া বাড়বে…”

স্থূল শরীরটা নিয়ে কোনও রকমে টোটো থেকে নামলেন দুলাল গড়াই। পাঞ্জাবি ঠিকঠাক করে ছড়ি নাচাতে নাচাতে বাড়ির ভিতরে ঢুকলেন। টোটোচালক একরাশ বিরক্তি নিয়ে বসে থাকল। বাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার আসছে। পাঁচ মিনিট পর নিজের মনে বকবক করতে করতে ফিরে এলেন গড়াই-বাড়ির ছেলে, “শালা, ছিলি আমাদের বাড়ির চাকর! আমাদের মেরে ফুলেফেঁপে এখন আর আমাদেরই চিনতেই পারে না।”

মুখের ভাব দেখে অনেক কিছু বোঝা যাচ্ছে। টোটোচালক জিজ্ঞেস করল, “কী, টাকা ধার দিল না?

“ধার? গড়াই-বাড়ির ছেলেরা কারও কাছে হাত পাতে না জানবি। ও-ই আমার কাছে ধার করেছে, তাগাদায় গিয়েছিলাম...”

“তা এ বার কোথায় যাবেন? আর কোনও খাতকের বাড়ি?”

“সব শালা আমাদের মেরে খেয়েছে… এখন আর চিনতে পারে না। তুই এক কাজ কর, এই আংটিটা রাখ! সোনার আংটি রে, দুই ভরি! রাখ। এ জিনিস কেউ চোখে দেখেনি। দু’ভরি দিয়ে কেউ আংটি বানায় না। এটা আমার ঠাকুরদার আংটি, তোর ভাড়ার টাকা কেটে আমায় কিছু টাকা দে, হাজার খানেক, কাল বাড়ি আসিস, দিয়ে দেব। মদের দোকানে যাব, শালা আর ধারে দেবে না।”

টোটোচালক বলল, “তা হলে বিকেলে ঘুরতে আসার আসল কারণ মদ! আমার কাছে অত টাকা নেই, শ’চারেক হতে পারে, চলবে?”

দুলাল গড়াই আঙুল থেকে আংটিটা খুলতে খুলতে বলল, “শ’চারেক! আচ্ছা তা-ই দে, একটা ছোট বোতল হয়ে যাবে।”

“কিন্তু ওই আংটি খুলতে হবে না। আমি এমনি দিচ্ছি, ওটা আপনার আঙুলেই থাক।”

“না না, ও-সব হবে না, আংটি নিতেই হবে। আমরা গড়াই-বাড়ির ছেলে, কারও কাছে হাত পাতি না।”

ফেরার সময় আর কোনও কথা বললেন না দুলাল গড়াই। পেটে মাল পড়েছে। চোখ বুজে চলে এলেন। নামার সময় বললেন, “শোন, তোর নামটা কী যেন... থাক এখন বলতে হবে না। মনে থাকবে না। কাল বিকেলে এসে বলিস। কাল তোর টাকা মিটিয়ে দেব।”

আংটিটা ঝুটো কি না, স্যাঁকরার দোকানে যাচাই করে দেখল টোটোচালক। মিথ্যে বলেনি গড়াই-বাড়ির ছেলে। দুই ভরি থেকে একটু কম। স্যাঁকরা সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, “পুরনো আমলের জিনিস। এটা পেলেন কোথায়?”

“এটা যার আংটি, একটা সময় অনেক ছিল, এখন ঘটি ডোবে না। আমাকে বেচতে দিয়েছে।”

“বুঝেছি, ওই গড়াই-বাড়ির কর্তার… বড়লোকি চাল দেখাতে দেখাতে ক্ষয়ে যাচ্ছে।”

মনে মনে হিসাব কষে টোটোচালক। বেচলে আজকের বাজারে লাখ দুয়েক টাকা পাওয়া যাবে। এত টাকা এক সঙ্গে দেখেনি সে। এই টোটোটা নিজস্ব নয়। ভাড়া করা। টাকাটা নিলে টোটোটা নিজের হয়ে যাবে। টাকা তার খুব দরকার। নিজের একটা গাড়ি থাকলে দিনরাত পরিশ্রম করে যে টাকা পাওয়া যাবে, তাই দিয়ে সংসারটা দাঁড় করানো যাবে। মনে মনে অনেক হিসাব-নিকাশ চলল। রাত গভীর হলেও ঘুম আসতে চাইল না।

পরের দিন এ দিক-ও দিক থেকে টাকা জোগাড় করে রাখল দুলাল গড়াই। কিন্তু পাঁচটা বেজে গেল, টোটোওয়ালাটা তো এল না! আংটিটা বেচে খেল না তো? হাঘরে ছেলেদের এই দোষ। কথার দাম নেই। বনেদি রক্ত তো নেই শরীরে। লোভ আছে।

দরজায় টোকা পড়ল। একমাত্র বয়স্ক চাকর হরিপদ এসে বলল, “এক জন ছেলে এইছে। রতন। আপনি কাল যার টোটোয় গেছিলেন।”

দুলাল গড়াই বলল, “হ্যাঁ, ওর টোটোয় আজও ঘুরতে যাব। ডাক ওকে। ওকে তুই চিনিস?”

হরিপদ বলল, “হ্যাঁ চিনি তো, বাপটা মরি গেল করোনায়। ও নিজি লেখাপড়া করত। বিএ পাশ। একন টোটো চালায়। কিন্তু ও তো দাঁড়াল না। এই সোনার আংটিটা আপনাকে দিয়ে দিতে বলল। আপনার আংটি ওর কাছে গেল কেমন করি?”

দুলাল গড়াই গম্ভীর হয়ে বলল, “দিয়েছিলাম, আমার কাছে দুঃখের কথা বলছিল... আমরা গড়াই-বাড়ির ছেলে, মন করলে সারা পৃথিবী লিখে দিতে পারি, এ তো সামান্য আংটি। কিন্তু সহ্য করতে পারল না, দুধ-ঘি কি সবাই সহ্য করতে পারে! তাই ফেরত দিয়ে গেল। রেখে দে, কাল স্যাঁকরা ডেকে যাচাই করে নিতে হবে।”


আরও পড়ুন