ব্রাত্য বসু। —ফাইল চিত্র।
এমন কঠিন যুদ্ধ কি আগে কখনও লড়েননি তিনি? হালকা ডজে প্রশ্নটা ছিটকে বেরোলেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না ফুটবলপ্রেমী ব্রাত্য বসু। “বিজেপি ঝাঁপিয়েছিল ২০২১-এও, কিন্তু এ বার অনেকটা পরিকল্পিত ভাবে জাল বিছিয়েছে। ইডি, সিবিআই, এনআইএ, এসআইআর— কিছুই বাকি রাখছে না। তবে মমতাদিই পাল্টা মোকাবিলা করছেন”, কণ্ঠে সাবধানি ছোঁয়াচ ব্রাত্যের।
যুদ্ধের নিয়ম মেনে ভোটযুদ্ধ লড়লেও একটা স্বকীয়তা বজায় রাখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সদ্য বিদায়ী সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে ধ্বস্ত দলে নানা চ্যালেঞ্জ, মামলা-মোকদ্দমায় স্কুল শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষার চাকা সচল রাখাই যাঁর কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সকালে রোড শো, সান্ধ্য স্ট্রিট কর্নার, দলের হয়েসাংবাদিক সম্মেলনের ফাঁকে লেখালিখি, নিজের নতুন ছবির কালার কারেকশনও ব্রাত্য খেয়াল রাখছেন। তবে, ভোট-প্রচারে আরও অনেক তৃণমূল বিধায়কের মতো পাগড়ি পরে রামনবমীর মিছিলে যাননি। বরং, পয়লা বৈশাখে কলেজ স্ট্রিটে নিজের দু’টি বই প্রকাশের অনুষ্ঠান সেরে এসেছেন।
ভোট-প্রচারের শুরুতেই কর্মিসভায় বিধানসভা এলাকার পুরপ্রতিনিধিদের চাপান-উতোর ঠেকাতে ভাল পারফরম্যান্সের গাজর ঝোলাতেও কসুর করেননি। সভায় ব্রাত্য বলেছেন, বিধানসভা ভোটে ওয়ার্ড-পিছু বুথ-ভিত্তিক ফল দেখেই দিদির কাছে ২০২৭-এর পুর ভোটে প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবেন।
দক্ষিণ দমদম পুর এলাকার ১৭টি ওয়ার্ড এবং দমদম পুরসভার ২২টি ওয়ার্ড মিলিয়ে আজকের দমদম বিধানসভা কেন্দ্র এলাকায় ক্লাইভ হাউস চত্বরে লেগে ক্লাইভ-মিরজাফরদের স্মৃতি। তবে, প্রাক্-স্বাধীনতা যুগে সম্পন্ন ইংরেজ, বাঙালিদের বাগানবাড়ি বিলাস কিংবা স্বাধীন দেশে হাজারো উদ্বাস্তু মানুষের কলোনি, কারখানায় রক্তক্ষয়ী শ্রমিক আন্দোলনের অধ্যায় দমদম অনেকটাই পিছনে ফেলে এসেছে। পরশুরামের গল্পেও বিরিঞ্চিবাবাকে দেখতে দমদমায় গুরুপদবাবুর বাগানবাড়িতে হামলে পড়েছিল কলকাতা। এখন ৫-৬ ফুটের গলিতেই মাথা তুলছেসুখবৃষ্টি অ্যাপার্টমেন্ট, আনন্দ ভবনের মতো বাহারি নামের পাঁচ-ছ’তলা ক্যাটকেটে বহুতল। সরু গলি দিয়ে যেতে যেতে রোড-শোয়ে বিগলিত চোখে বারান্দায় ভোটারদের সম্ভাষণ জানাচ্ছেন প্রার্থী।
গলিতে বা একদা নামজাদা নানা কারখানার পরিত্যক্ত জমিতে প্রোমোটারিই এ দমদমের প্রধান শিল্প বললে অত্যুক্তি হবে না। সেই প্রোমোটারির সূত্রে পুরপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগও হাওয়ায় ভাসছে। শুধু বিরোধী প্রার্থীরা নন, তৃণমূলের কোনও অভিমানী পুরপ্রতিনিধিও বলে বসছেন, মমতা, অভিষেক বা ব্রাত্যদা নন, ভোটটা কিন্তু কয়েক জন পুরপ্রতিনিধির জনতার সঙ্গে ব্যবহার মেপেই ঘটবে।
বাগজোলা খাল লাগোয়া এলাকা বা বিমানবন্দরের এক নম্বর গেটের কাছে জলভাসি দমদমেরআখ্যানেও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিখ্যাত ‘হ্যালো দমদম’ কবিতা মনে পড়ে। বর্ষায় থানায় ফোন করে রেসকিউ বোট চাওয়ার পরিস্থিতি হয়তো নয়! তবে সিপিএম প্রার্থী, এসএফআইয়ের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস উন্নয়নের জেরে রাস্তা উঁচু-নিচুতে জনতার চরম ভোগান্তি বোঝাচ্ছেন!ব্রাত্যের মতোই প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী ময়ূখ। ভূগোলের ছাত্র। দমদমের ভূগোল, অঙ্ক— দুটোরই হিসাব কষে মল রোডের আবাসন থেকে পুরনো ‘লাল দুর্গ’ বেদিয়াপাড়া, নলতা, বাদরা, কমলাপুরে ভোট চাইছেন। তাঁর দাবি, রামে যাওয়া ১৫-২০ হাজার বাম ভোট ফেরাতে পারলেই তাঁকে এ ভোটে সমীহ করতে হবে!
ময়ূখের সুভদ্র উপস্থিতি টানলেও বদলাতে সিপিএমে এখনই পুরো ভরসা নেই মল রোড বা গোরাবাজারের বহুতল আবাসনের বাসিন্দাদের। কিন্তু ভোট শিয়রে এলেও কারও কারও প্রশ্ন, বিজেপির প্রার্থীটি কে? গতবারের বিজেপি প্রার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দকে এক সময়ে টিভি চ্যানেলের তরজায় অনেকেই চিনতেন। ময়লাখানা মোড়ের কাছে বিজেপির ভোটকালীন পার্টি অফিসে অপেক্ষার সময়ে ফিসফাস কানে আসে, গত বার হারলেও বিমলদা দাঁড়ালেই কার্যকর্তারা বেশি চাঙ্গা হতেন। তবে হাই কোর্টের আইনজীবী, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের প্রাক্তনী অরিজিৎ বক্সী বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি। তিনি বুক চাপড়েই বলছেন, “কমিশন, আধাসেনার ভূমিকা ঠিক থাকলে আমার দমদম জয় নিশ্চিত!” দমদমের নাগরিক দুর্ভোগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় সতর্কতায় মেয়েদের শাঁখা-পলা খুলতে বলা তিনি ভোটের ‘ইসু’ করছেন।
তৃণমূল ও বিজেপি— দুটোই মুদ্রার এ পিঠ-ও পিঠ, সরব কংগ্রেস প্রার্থী সুস্মিতা বিশ্বাসও। “দুর্নীতি, দাদাগিরি আর ধর্ম নিয়ে অধর্মইরাজ্যটাকে ডোবাল”, বলছেন দক্ষিণ দমদমের প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি সুস্মিতা। ময়ূখের মতো তিনিও তৃণমূল-বিজেপি বাইনারি ভাঙায় মরিয়া। মন্দির, মসজিদ, দমদমের খ্রিস্টানজনসংখ্যার গির্জা, হরিচাঁদ গুরুচাঁদ ঠাকুরের নামগানে সামাজিকতা তৃণমূল, সিপিএম কিছুই বাদ দিচ্ছে না। সেই সঙ্গে ব্রাত্য বলছেন, “এসআইআরে অনেক নাম বাদ গেলেও বিবেচনা পর্বেই কয়েক হাজার নাম ফেরাতে তৃণমূলই তৎপর হয়েছে।”
দমদম পুর এলাকায় গত লোকসভা ভোটে মাত্র কয়েকশো ভোটেএগিয়ে ছিলেন সৌগত রায়। তবে সেখানেও অবাংলাভাষী ভোট বিজেপির ঝুলিতে যাওয়ার অঙ্ক উড়িয়ে তৃণমূলের লিডের ধারাবাহিকতায় বিশ্বাস রাখছেন গত তিন বারের জয়ী প্রার্থী ব্রাত্য। বছরভর উৎসব, মেলায় দমদমের জীবন-নাট্য মাতিয়েও রেখেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব নেতা। হতদরিদ্রদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, ফুটবল স্টেডিয়ামের পরে উড়ালসেতুর স্বপ্নও দেখাচ্ছেন। এমন নানা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতেই দমদম রোডের জ্যাম-জট ঠেলে বিধানসভার হাইওয়েতে ওঠার সফর জমজমাট।