অবৈধ: নিউ টাউনের লস্করহাটি এলাকায় খালপাড়ে বেআইনি ভাবে তৈরি হয়েছে বাড়ি। ছবি: স্নেহাশিস ভট্টাচার্য।
চক পাঁচুরিয়ায় দাঁড়িয়ে পচা খালের অন্য পারে নব্য উপনগরীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতলগুলিকে স্বার্থপর দৈত্যের মতো মনে করেন স্থানীয় মানুষ। যত সুখ যেন সেখানেই। ঝাঁ চকচকে রাস্তা, ঝলমলে আলো, ভূপৃষ্ঠের জল, উন্নত চিকিৎসা— কী নেই! খালের অন্য দিকের গ্রামে সন্ধ্যা নামলে সর্বত্র আলো জ্বলে না। চিকিৎসার প্রয়োজনে ছুটতে হয় কলকাতায়। পানীয় জলের জন্য মাটির নীচের জলই ভরসা।
গ্রাম ও শহরের নাম জুড়ে পনেরো বছর আগে এই বিধানসভা কেন্দ্রের নাম হয় রাজারহাট-নিউ টাউন। নিউ টাউনের প্রান্তে পাথরঘাটা পঞ্চায়েতের চক পাঁচুরিয়ায় শোনা গেল এক প্রৌঢ় দোকানির আক্ষেপ। তাঁর কথায়, “আমাদের জমিতে শহর হল। একটি দল নির্মাণ সামগ্রীর কারবারে ফুলেফেঁপে উঠল। তারাই নেতা হয়ে শাসকদলের পার্টি অফিস খুলেছে। বড় বাড়ি করেছে, দামি গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসার সুবিধা নেই। একটা শংসাপত্র পেতেও টাকা দিতে হয়।”
বিধাননগর পুরসভার ১১টি ওয়ার্ড এবং পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত মিলিয়ে রাজারহাট-নিউ টাউন কেন্দ্র। নির্মাণ সিন্ডিকেট ঘিরে এই বিধানসভা এলাকা একাধিক বার শিরোনামে এসেছে। আগে সিন্ডিকেটের প্রভাব শহর নিউ টাউনে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা গ্রামেও ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ। কেন্দ্রের খবর, সেই টাকাতেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে গ্রামের রাজনীতি। তোলাবাজি, কাটমানি, খালপাড়ে দোকান বসানো, পুকুর ভরাট— এই সব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। তারই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেরুকরণের হাওয়া।
ভোটের প্রচারে এক দিকে শাসকদল লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুব সাথী, পাড়ায় সমাধানের মতো সরকারি প্রকল্পকে সামনে রাখছে। অন্য দিকে, বিরোধী দলগুলি তুলে ধরছে পুকুর ভরাট, পানীয় জলের অভাব, ভাঙা রাস্তা, আলো ও দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সমস্যা। ফলে এ বার এই কেন্দ্রে লড়াই তৃণমূলের জন্য কঠিন বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। শহর এবং গ্রাম— দু’জায়গাতেই বিজেপি ও সিপিএমের দেওয়াল লিখন ও পতাকা নজরে পড়ছে। প্রচারকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্রার্থী দিয়েছে কংগ্রেসও।
গত বিধানসভা নির্বাচনে ৫৬ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী তৃণমূল প্রার্থী তাপস চট্টোপাধ্যায় এখনও এই কেন্দ্রে একটি আলাদা ভাবমূর্তি ধরে রেখেছেন। সিপিএমের সুভাষ চক্রবর্তীর অনুগামী হিসেবে পরিচিত ‘জিম্বো’ দলমত নির্বিশেষে মানুষের পাশে থাকার জন্য এলাকায় এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিলেন। সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে এসে সেই ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়েই জয় পেয়েছিলেন তিনি। এ বারও ভাবমূর্তিই তাঁর অন্যতম ভরসা বলে খবর।
বিধাননগর পুরসভার ১ থেকে ৫ নম্বর ওয়ার্ড, বিশেষ করে নারায়ণপুর এলাকা তাপসের একেবারে নিজস্ব ‘গড়’ বলে পরিচিত। কিন্তু এলাকায় চোখে পড়ল বিজেপি ও সিপিএমের পতাকা। বিজেপি প্রার্থী পীযূষ কানোরিয়া বলেন, “রাজারহাট-নিউ টাউন কেন্দ্র তৃণমূল সিন্ডিকেটের স্বর্গে পরিণত হয়েছে। এক জমি চার বার করে বিক্রি হচ্ছে। গৌরাঙ্গনগরে খাস জমি দখল করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাজ আটকে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের পুরপ্রতিনিধির এলাকাতেই স্কুলে মিড-ডে মিল চালু হয়নি। গ্রামের রাস্তায় আলো জ্বলে না।”
পীযূষের দাবি, তাপসের শক্ত ঘাঁটি নারায়ণপুরে বার বার প্রচার চালিয়ে সেখানেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হবে। তাঁর সংযোজন, “নারায়ণপুরে তাপসবাবুর মেয়ের ওয়ার্ডেই রাস্তায় হাঁটা যায় না। নলকূপের জল খাওয়ার অযোগ্য। এটাই উন্নয়ন? উন্নয়ন না করে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে ভোট টানার চেষ্টা হচ্ছে। এ বার ভোট সনাতন ধর্ম রক্ষার লড়াই— সব পাল্টে যাবে।”
তবে পীযূষের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার বিষয়টি তুলে আনছে তৃণমূল। একটি খুন-সহ একাধিক প্রতারণার মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তার মধ্যে সাতটি মামলায় চার্জ গঠন হয়েছে। পীযূষের অবশ্য দাবি, চারটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “আমি হলফনামায় কিছু গোপন করিনি।’’
অন্য দিকে, এসআইআর-কে ঘিরে মতুয়া ভোটারদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগও উঠেছে গৌরাঙ্গনগর, সত্যজিৎপল্লি, আদর্শপল্লির মতো এলাকায়। পাঁচ বছর আগে যে মতুয়া পরিবারের বাড়িতে বসে অমিত শাহ খেয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ এখন তৃণমূলের হয়ে প্রচার করছেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। তাঁদের বক্তব্য, তাপস বামফ্রন্টে থাকার সময়েই আদর্শপল্লিতে মতুয়া ধর্মগুরুর মন্দির তৈরি করেছিলেন। যদিও পীযূষের দাবি, “সিএএ আইনে নাম বাদ পড়া মতুয়ারা নাগরিকত্ব পাবেন।’’
ধর্মীয় মেরুকরণের এই আবহ যে এলাকায় রয়েছে, তা বোঝা গেল বিষ্ণুপুর বটতলায় স্থানীয়দের কথাবার্তায়। তাঁদের মতে, শাসকদলের কিছু নেতার আচরণের ফলেই মেরুকরণ বেড়েছে। কাটমানি ও তোলাবাজির অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ। তাপস ব্যক্তিগত ভাবে সাহায্য করলেও নিচুতলার কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
তবে তাপস চট্টোপাধ্যায় মেরুকরণের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। কাটমানি, তোলাবাজি বা পুকুর ভরাটের অভিযোগও নস্যাৎ করেছেন। তাঁর যুক্তি, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সনাতনের পক্ষে। নিউ টাউনের দুর্গাঙ্গন তাঁরই উদ্যোগে হয়েছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে একশোর বেশি মন্দির তৈরি করেছি। পীযূষবাবু এলাকার বাসিন্দাই নন— তিনি কতটা জানেন?” তিনি আরও জানান, বিধায়ক তহবিলের বাইরেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু কাজ করেছেন— চারটি অ্যাম্বুল্যান্স দেওয়া, অনাথ শিশুদের সাহায্য, এক আত্মঘাতী দম্পতির মেয়ের দায়িত্ব নেওয়া ইত্যাদি। এই বিষয়গুলিকেই সামনে রেখে বিজেপির আক্রমণের জবাব দিচ্ছেন তাঁর অনুগামীরা।
তবে কি তাপসকে আগলাচ্ছে তাঁর ‘জিম্বো’ ইমেজ? প্রশ্ন শুনে হেসে তাঁর জবাব, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।” তাঁর বাড়িতে এখনও জ্যোতি বসু ও সুভাষ চক্রবর্তীর ছবির পাশে বর্তমান দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ছবি টাঙানো।
গ্রামীণ সমস্যার প্রসঙ্গে তাপসের বক্তব্য, পঞ্চায়েতের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। “বিদ্যুতের বিল দেওয়ার সামর্থ্য নেই, ফলে আলো লাগালেও জ্বালানো যায় না। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছি। চেষ্টা করছি এই এলাকাগুলিকে শহরের আওতায় আনতে, তা হলে পুরসভার মাধ্যমে পরিষেবা বাড়ানো যাবে। পানীয় জলের প্রকল্প জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর বাস্তবায়ন করছে,” বলেন তিনি।
এই লড়াইয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে রয়েছেন সিপিএম প্রার্থী সপ্তর্ষি দেব, যিনি আইএসএফের সমর্থন পাচ্ছেন। ভাঙড় থেকে রাজারহাট পর্যন্ত পঞ্চায়েত এলাকায় সংখ্যালঘু সমাজে ইতিমধ্যেই প্রভাব বিস্তার করেছে আইএসএফ। পাথরঘাটা পঞ্চায়েতের তৃণমূলের এক নেতাও আইএসএফে যোগ দিয়েছেন। পাঁচটি পঞ্চায়েত ও নারায়ণপুর এলাকার সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের বরাবরের শক্তি। তবে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে শহর নিউ টাউনে শাসকদলের কর্মীদের ‘দাদাগিরি’ নিয়ে ক্ষোভের প্রভাব পড়েছিল লোকসভা ভোটেও।
সপ্তর্ষির দাবি, “বিজেপি প্রার্থী বহিরাগত। এমনকি, তিনি তৃণমূলের নেতাকে থানা থেকে ছাড়াতেও গিয়েছেন। এখানে বিজেপি কার্যত তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে। সংখ্যালঘুরা এ বার সিপিএমের দিকেই থাকবেন। মতুয়ারাও সঙ্গে আছেন, কারণ এসআইআরে বহু নাম বাদ পড়েছে— কেউ পাশে দাঁড়ায়নি।” তিনি শিখরপুরে ফুল চাষি ও রুপোর গয়নার কারিগরদের জন্য হাব তৈরির প্রস্তাবও প্রচারে তুলে ধরছেন।
রাজারহাট-নিউ টাউনের কংগ্রেস প্রার্থী শেখ নিজামুদ্দিনও সংখ্যালঘু ভোটে ভরসা রাখছেন। তাঁর দাবি, “এ বার তৃণমূল কিছু করতে পারবে না। ওদের হার অনিবার্য।”
সব মিলিয়ে ক্ষোভ, উন্নয়ন-বৈষম্য, সিন্ডিকেট রাজনীতি এবং মেরুকরণের আবহে রাজারহাট-নিউ টাউনের ভোটের ফলাফল এ বার অনেকটাই অনিশ্চিত।