West Bengal Elections 2026

এ বার কমিশন নিযুক্ত ৪ পর্যবেক্ষককে নিয়ে প্রশ্ন তৃণমূলের! দাবি, কেউ বিজেপি-ঘনিষ্ঠ, কেউ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত

মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত এক পুলিশ পর্যবেক্ষককে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল। এ বার তারা প্রশ্ন তুলল চার বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য নিযুক্ত চার পর্যবেক্ষকের নিয়োগ নিয়ে। বিঁধেছে নির্বাচন কমিশনকেও।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ১৭:৩৬
বৃহস্পতিবার দুপুরে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে (বাঁ দিকে) সায়নী ঘোষ এবং ব্রাত্য বসু (ডান দিকে)।

বৃহস্পতিবার দুপুরে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে (বাঁ দিকে) সায়নী ঘোষ এবং ব্রাত্য বসু (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত এক পুলিশ পর্যবেক্ষককে নিয়ে আগেই প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল। এ বার তারা প্রশ্ন তুলল কমিশন নিযুক্ত চার পর্যবেক্ষককে নিয়ে। চার বিধানসভা কেন্দ্রের চার পর্যবেক্ষকের ছবি দেখিয়ে তাঁদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যের শাসকদল।

Advertisement

বৃহস্পতিবার তৃণমূল যে চার পর্যবেক্ষকের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেই তালিকায় রয়েছেন— গাজোলের পর্যবেক্ষক ধীরজ কুমার, বনগাঁ দক্ষিণের পর্যবেক্ষক অজয় কাটেসারিয়া, বালিগঞ্জের পর্যবেক্ষক গণ্ডম চন্দ্রুডু এবং মধ্যমগ্রামের পর্যবেক্ষক অরিন্দম ডাকুয়া। তৃণমূলের দাবি, কমিশন নিযুক্ত ওই পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কারও বিরুদ্ধে জমি কেলেঙ্কারি, আবার কারও বিরুদ্ধে পণকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। কেউ আবার বিজেপির ঘনিষ্ঠ বলে দাবি রাজ্যের শাসকদলের। যদিও তৃণমূলের এই দাবির সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।

গত মঙ্গলবার মালদহের চার কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশ পর্যবেক্ষক জয়ন্ত কান্ত এবং তাঁর স্ত্রীর ছবি প্রকাশ করে তৃণমূল দাবি করে, কমিশন নিযুক্ত পুলিশ পর্যবেক্ষকের স্ত্রী বিহারের বিজেপি নেত্রী। সে দিন তৃণমূল ভবন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে এই দাবি করেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং সাংসদ পার্থ ভৌমিক। বৃহস্পতিবারের সাংবাদিক বৈঠকেও ছিলেন ব্রাত্য। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাংসদ সায়নী ঘোষ। তাঁরা চার পর্যবেক্ষকের ছবি এবং তার নীচে লেখা কিছু ‘অভিযোগ’ প্রকাশ্যে আসেন।

বনগাঁ দক্ষিণের পর্যবেক্ষক অজয়ের ছবি দেখিয়ে ব্রাত্য বলেন, “কী ভাবে জ্ঞানেশ কুমার তাঁর বস‌্ অমিত শাহের পরামর্শে বেছে বেছে লোক পাঠাচ্ছে দেখুন। এটি তার একটি জলজ্যান্ত প্রমাণ।” শাসকদলের দাবি, অজয় মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার কালেক্টর থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। ব্রাত্য বলেন, “প্রায় ৪০ একর সরকারি খাস জমি টেন্ডার ছাড়াই লোকজনকে বিলিয়ে দিচ্ছিলেন। শিবরাজ সিংহ চৌহানের তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ সরকার তাঁকে সতর্ক করে দেয়। তাঁর বিরুদ্ধে রেওয়ার কমিশনার তদন্ত চালান। তাতে তিনি ‘দোষী সাব্যস্ত’ হন। বিজেপির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ কিন্তু ২০২৫ সালে সরকার বদলে যায়। শিবরাজ সিংহ চৌহান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে দিল্লিতে চলে যান। পরে যে বিজেপি সরকার আসে, তারা আরও একটি কমিশন বসিয়ে তাঁকে ক্লিনচিট দেয়। এক বিজেপি সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে, আর এক বিজেপি সরকার তাঁকে ছাড় দিচ্ছে। এই লোককে বনগাঁ দক্ষিণে পাঠিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার।”

একই রকম ভাবে গাজোলের পর্যবেক্ষক ধীরজের বিরুদ্ধেও ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। ধীরজের ছবি দেখিয়ে সায়নী বলেন, “সব এক সে বঢ় কর এক! কাকে ছেড়ে কার কথা বলবেন! যাঁদের ছবি দেখানো হচ্ছে, তাঁরা আর যা-ই হোন, নিরপেক্ষ নন।” সায়নী আরও দাবি করেন, শিন্দে-ফড়নবীসের মহারাষ্ট্র সরকারের স্বাস্থ্য দফতরে কমিশনার হিসাবে কাজ করতেন ধীরজ। ওই সময়ে আট হাজার কোটি টাকার অ্যাম্বুল্যান্স বরাত দুর্নীতি হয়েছিল। সায়নী বলেন, “আট দিনের মাথায় টেন্ডার ডাকা হয়। ওখানকার বিরোধীরা বলেন, স্থানীয় নেতার আত্মীয়কে সাহায্য পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাঁকে বদলি করে দেওয়ার হুমকি অবধিও দেওয়া হয়।” তৃণমূলের দাবি, যাঁদের বিজেপির প্রতি কোনও না কোনও ভাবে ‘দায়বদ্ধতা’ রয়েছে, তাঁদেরই বেছে বেছে আনা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে।

তৃণমূলের দাবি, মধ্যমগ্রামের পর্যবেক্ষক অরিন্দমও ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির দফতরে কাজ করতেন। সমাজমাধ্যমে তৃণমূল যে ছবিগুলি পোস্ট করেছে, তাতে লেখা অরিন্দম ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। ব্রাত্য বলেন, “এর থেকে বোঝা যায় কেমন লোককে পাঠানো হচ্ছে। এটি কোনও টেকনিক্যাল পোস্টিং নয়। রাজনৈতিক দফতরের সঙ্গে মন্ত্রীর অফিসের সমন্বয় সাধন করতেন, এমন লোক চলে এসেছেন এখানে আমাদের পর্যবেক্ষক হয়ে।” তাঁকে পর্যবেক্ষক করা একটি ‘রাজনৈতিক নিয়োগ’ বলে দাবি রাজ্যের শাসকদলের। সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল আরও দাবি করে, বালিগঞ্জের পর্যবেক্ষক গণ্ডমের বিরুদ্ধেও পণের দাবিতে অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল। ২০১৮ সালে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের আদিবাসী উন্নয়ন দফতরে ডিরেক্টর থাকাকালীন এই অভিযোগ উঠেছিল বলে জানাচ্ছে তৃণমূল। বালিগঞ্জের পর্যবেক্ষকের ছবি দেখিয়ে সায়নী বলেন, “ইনিও সাংঘাতিক। ফৌজদারি মামলা, পণ, লেনদেন, হেনস্থার অভিযোগ রয়েছে।” ব্রাত্য বলেন, “আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। একটি পণ সংক্রান্ত মামলায় আদিবাসীদের তিনি হেনস্থা করেন। সরাসরি বিজেপির আস্থাভাজন এবং বিজেপির ঘনিষ্ঠ আমলা।”

এই তথ্য ‘ফাঁস’ করে তৃণমূল ফের এক বার বিজেপি এবং কমিশনের আঁতাঁতের তত্ত্ব তুলে ধরেছে। সমাজমাধ্যমে তারা লিখেছে, “চোর ধরতে চোরকে কাজে লাগানো— এই পুরনো প্রবাদ আমরা সকলেই শুনেছি। কিন্তু এ বার ভ্যানিশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশন যা করছে, তা হল— চোরকে দিয়ে নির্দোষ মানুষকে হেনস্থা করা। বিহারের এক বিজেপি নেত্রীর স্বামীকে কী ভাবে মালদহে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে, তা আমরা আগেই ফাঁস করেছি। এ বার পশ্চিমবঙ্গের জন্য ‘ভ্যানিশ কমিশন’-এর বেছে নেওয়া আরও চার পর্যবেক্ষকের তালিকা দেওয়া হল।”

কমিশনকে খোঁচা দিয়ে তৃণমূলের বক্তব্য, “এই লোকদের (চার পর্যবেক্ষক) উপরেই রাজ্যে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ ভোট করানোর দায়িত্ব দিয়েছে কমিশন। ভ্যানিশ কমিশন এখন বিজেপির হয়ে নিয়োগকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, জমি কেলেঙ্কারির মাথা, যৌতুকের মামলায় অভিযুক্ত এবং বিজেপির অনুগতদের পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করেছে। ভ্যানিশ কুমার প্রতি দিন নির্লজ্জতার নতুন নতুন নজির গড়ছেন।”

Advertisement
আরও পড়ুন