(বাঁ দিকে) ডোমকলে প্রচারে সিপিএম প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান (রানা) এবং কংগ্রেসের সমাবেশে জনতা। শমসেরগঞ্জে। (ডান দিকে)। — নিজস্ব চিত্র।
পদ্মার ভাঙা শাখা নদীর চরে সন্ধ্যা নামছে। পারে থোকা থোকা লোক। শরীর-মন জুড়িয়ে দেওয়া বাতাসে দুলছে ঘাসবন। সেই হাওয়ায় দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে দোলাচলে যেন কামাল শেখ, আবুল হোসেনেরাও।
‘‘এখানে কাজ কোথায়? আমাদের এবং আশপাশের গ্রামের কত ছেলে কেরলে কাজ করে। ওখানে আয় বেশি, নিরাপত্তার সমস্যা নেই। ভোটের জন্য মারামারি করে কী হবে, কাজের কথাই তো ভাবতে হবে!’’ আক্ষেপ কামালের। সায় দিয়ে আবুল বলেন, ‘‘কিছু লোক খেতে কাজ করে। বাকিরা রাজমিস্ত্রীর। কিন্তু সে কাজ বারো মাস থাকে না, মজুরিও অল্প।’’ নদীর ভাঙনে তলিয়ে যাওয়া ঘর, হারিয়ে যাওয়া কাগজপত্রের গল্পের সঙ্গেই বারেবারে ফিরে আসে জীবন সংগ্রামের বারোমাস্যা।
তাঁদের কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ে গঙ্গার কাছে ধুলিয়ানে যুবক সাবিরের সেই প্রশ্ন। ‘‘রাজ্যে ১৫ বছর স্থায়ী সরকারই তো আছে। আমাদের কাজের জন্য কী হয়েছে?’’ সাগরদিঘির জামালউদ্দিনও বলেছিলেন, ‘‘নানা রকম ভাতা পাওয়া যাচ্ছে, ঠিক আছে। কিন্তু লেখাপড়া করে তার পরে ছেলেমেয়েগুলো করবে কী?’’ নানা অঞ্চলেই কাজের কথা বলার ফাঁকে অসহায় মানুষ তুলে আনেন গ্রামে, মহল্লায় আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া শাসক দলের জনপ্রতিনিধিদের কথা।
আলাপচারিতাতেই টের পাওয়া যায়, প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার উপাদান আর পাঁচ রকম লোকের মতো জমে আছে সংখ্যালঘুদের মনেও। সেই সংখ্যালঘুদের মন পেতে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছে কংগ্রেস, সিপিএম। আর শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এ সবই ঢেকে ফেলার চেষ্টা করছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নামক চাদরে!
পাঁচ বছর আগে মুর্শিদাবাদ জেলার সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত সব আসনে পাহাড়প্রমাণ সব ব্যবধানে জয় পেয়েছিল তৃণমূল! বিজেপি ক্ষমতায় এসে যেতে পারে এবং এলেই এনআরসি করে তাড়িয়ে দেবে, এই প্রচারে সে বার কাজ হয়েছিল। সংখ্যালঘু ভোট এককাট্টা হয়ে পড়েছিল সরকারি দলের ঝুলিতে। এক সময়ে যতই মাটি শক্ত থাক, সে বার কংগ্রেস এবং সিপিএম এই দ্বিমেরু যুদ্ধে হালে পানি পায়নি। এ বার সংখ্যালঘু এলাকায় লোক মিলছে এই প্রশ্ন তোলার যে, ‘‘সবাই মিলে ভোট দিলাম। তার পরে এক এক জন ২৭ লক্ষ টাকার গাড়ি চড়ছে, তিন লক্ষ টাকার ঘড়ি পরছে, বাড়ি-সহ সব রকমের প্রকল্প থেকে কাটমানি তুলছে। আমাদের কী হল!’’
কংগ্রেসের সমাবেশে জনতা। শমসেরগঞ্জে। — নিজস্ব চিত্র।
রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় চলে আসার ‘ভয়’ পঞ্চায়েত ভোটে ছিল না। সেই ভোটে এবং লোকসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোট তৃণমূলের একটচেটিয়া ভোটে ভাগ বসিয়েছিল। ওয়াকফ প্রতিবাদের সময়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকা, এসআইআর-প্রতিবাদে সিআইডি দিয়ে ধরপাকড় সংখ্যালঘু মনে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে। কংগ্রেস প্রার্থী আলফাসুদ্দিন বিশ্বাস, নাসির শেখ, মনোজ চক্রবর্তী, আব্দুর রাজ্জাক মোল্লারা এক সুরে দাবি করছেন, সংখ্যালঘু সমর্থনে তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন শেষ। সিপিএমের ডোমকলের প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান (রানা)ও বলছেন, ‘‘কাজের সুযোগ, শিক্ষার অবস্থা-সহ নিজেদের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে মানুষ ভাবিত। সংখ্যালঘুরাও নিজেদের সমস্যার কথা ভেবে ভোট দেবেন। যেখানে মুসলিমেরা অনেকটাই সংখ্যালঘু, সেখানে আলাদা কথা হতে পারে। কিন্তু এ দিকে ২০২১-এ হয়েছিল, আর হবে না।’’ জলঙ্গির সিপিএম প্রার্থী ইউনুস সরকারের মতে, ‘‘হয় বিজেপি, না হয় শুধুই তৃণমূল— এই দ্বিমেরু ভাবনাটা ভাঙাই এ বারের লড়াই।’’
এক দিকে যখন কাজের প্রশ্ন, বেলডাঙা, রেজিনগর, নওদার নানা অঞ্চলে আবার ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্য তর্ক। ‘‘সরকারি টাকায় যদি মন্দির হয়, একটা লোক নিজের উদ্যোগে বাবরি মসজিদ বানাতে চাইলে কীসের অসুবিধা?’’ লোক আছেন এই প্রশ্ন তোলার এবং সেই জোরেই ময়দানে নেমেছেন ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’র হুমায়ুন কবীর। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভোটের পরে পশ্চিমবঙ্গে কোনও বাবরি মসজিদ তৈরি করতে বিজেপি দেবে না। হুমায়ুন আবার পাল্টা হুঙ্কার ছেড়েছেন, ‘‘অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ করছি, ভোটের পরে কেন, এখনই বাবরি মসজিদের কাজ বন্ধ করে দেখাক! রাজ্য সরকারকেও চ্যালেঞ্জ করছি। আমি হুমায়ুন কবীর যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন কারও ক্ষমতা নেই আমাদের ট্রাস্টের কেনা জমিতে মসজিদ তৈরি হওয়া বন্ধ করবে!’’ তৃণমূলত্যাগী বিধায়ক যত এমন বলেন, হাততালিও জোটে। বিজেপির সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’র তত্ত্ব সামনে আনা গোপন ভিডিয়ো তৃণমূল বাজারে ছাড়ার পরে হুমায়ুনের বাজার পড়েছে ঠিকই। তবে মরেনি! একান্তে তৃণমূল, কংগ্রেস বা বিজেপি নেতারাও স্বীকার করছেন, ব্যক্তি হুমায়ুনের জয় হয়তো অসম্ভব নয়।
প্রার্থী দিয়ে আসরে আছে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির মিম-ও। স্বয়ং ওয়েইসি এসে ‘মোদী-দিদি ভাই-বোন’ তোপ দেগে তৃণমূল নেত্রীর বিজেপি-সঙ্গের অতীত মনে করিয়ে দিয়েছেন। হুমায়ুনের ভিডিয়ো-কাণ্ডের পরে তাঁর দলের সঙ্গে মিম-এর জোট ভাঙার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলেও স্থানীয় স্তরে জোটের নামেই প্রচার চলছে! তবে মুর্শিদাবাদের মাটিতে মিম-এর পরীক্ষা আগে যে হেতু সফল হয়নি, বাজি ধরার লোক তাই কম।
আর এ সব চেষ্টাই নস্যাৎ করে চলেছে শাসক দল। জঙ্গিপুর ও বহরমপুর-মুর্শিদাবাদ, তৃণমূলের দুই সাংগঠনিক জেলার সভাপতি খলিলুর রহমান ও অপূর্ব সরকারের একই মত। ‘‘বাংলায় বিজেপিকে রোখার ক্ষমতা একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা মমতার সরকার ছাড়া কে দেবে? সংখ্যালঘুরা সেটা খুব ভাল করে জানেন।’’ সঙ্গে সংযোজন, এসআইআর-এর নামে যে ভাবে ভোটারদের ‘নির্যাতন’ করা হয়েছে, তার বদলা ভোটে হবে।
তবে এতেই যে সব চিঁড়ে ভিজছে না, টের পাচ্ছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। রাহুল গান্ধী ঘুরে যাওয়ার পরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলে নির্দেশ দিয়েছেন, কংগ্রেস বা অন্য কাউকে ভোট দেওয়া মানে বিজেপিকেই সমর্থন করা— এই কথা প্রচারে আনতে হবে। কংগ্রেসের এক নেতার মন্তব্য, ‘‘ধর্মতলার ধর্না থেকে যিনি বলেছিলেন, বিজেপি ছাড়া যাকে খুশি ভোট দিন, তিনি এখন বলছেন কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া মানে বিজেপিকেই দেওয়া! চাপ তা হলে বোঝাই যাচ্ছে!’’