কলকাতায় আরিফিন শুভ। ছবি: ফেসবুক।
একই রঙের শার্ট-ট্রাউজার্স-ব্লেজ়ার। চুল টেনে বেঁধে পনিটেল। সযত্নে ছাঁটা গোঁফদাড়ি। চোখে রঙিন চশমা। আরিফিন শুভ। কথা শুরুর আগেই গেয়ে উঠলেন ‘হয়তো তোমারই জন্য’। আরিফিন শুভর সঙ্গে আড্ডা শুরু আনন্দবাজার ডট কম-এর।
প্রশ্ন: বাংলাদেশেও কি এখন কলকাতার মতোই বসন্ত? কোকিল ডাকছে?
আরিফিন: একই তো। ও পার বাংলাতেও এ পার বাংলার মতোই ঋতুবদল ঘটেছে। ওই দেশেও কান পাতলে কোকিলের ডাক শোনা যাচ্ছে।
প্রশ্ন: মঞ্চে হাঁটু গেড়ে বসে মহিলা সাংবাদিককে প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন! আপনি কি খুবই রোম্যান্টিক?
আরিফিন: আমার তো মনে হয় না। মনে হয়, আমি ঠিক এর উল্টো। তবে আমি খুবই ‘ফ্রেন্ডলি’। (হাত তুলে বললেন), শব্দটা ‘বন্ধুবৎসল’ হবে, তাই না? হ্যাঁ, আমি সেটাই। যাঁদের সঙ্গে অনেক দিনের চেনাশোনা, তাঁদের সঙ্গে খুনসুটি করি। আসলে, ২০২৪ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমার মা ওই বছর চিরবিদায় নিলেন। বুঝতে পারলাম, জীবন খুব ছোট। কে কী বলল, তুমি কী পেলে— কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এই ভাবনাকে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি বা চেতনা ভাববেন না। এটাই বাস্তব। আর কোনও কিছুই যখন চিরস্থায়ী নয়, তা হলে আমরা কেন এত গুরুগম্ভীর থাকব? আরেফিন তাই জীবনকে সহজ ভাবে নিতে শিখছে। বাকি জীবন পুরোপুরি বাঁচতে চাইছে। ও কী ভাবছে, এ কী বলল— এ সব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে। কারণ, আমি ভাবলেও লোকে আমায় বিচার করবে, না ভাবলেও।
প্রশ্ন: আপনার নতুন সিরিজ়ের বিষয় তো এত সহজ নয়!
আরিফিন: (হেসে ফেলে) উত্তর দিলে পুরো গল্প ফাঁস! এটুকু বলতে পারি, কোনও ভারী বিষয়কে কঠিন করে দেখানো বা বলা অনেক সহজ। বরং তাকে বিনোদনের মোড়কে মু়ড়ে পরিবেশন করা কঠিন। ‘জ্যাজ় সিটি’ সিরিজ়ে পরিচালক সৌমিক সেন সেটাই করেছেন। কখনও কৌতুক, কখনও ব্যঙ্গ, কখনও বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ সুন্দর করে সাজিয়ে পরিবেশন করা ভীষণই কঠিন, পরিশ্রমের কাজ।
প্রশ্ন: সৌরসেনী মৈত্রের সঙ্গে কাজ করে কেমন লাগল?
আরেফিন: এর আগেও অন্য সিরিজ়ে কাজ করেছি। এ বারে দৃশ্যের পরিমাণ বেশি। টানা অনেক দিন কাজ করতে করতে ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন: এই সিরিজ়ের জন্য আরিফিনকে অডিশন দিতে হয়েছে?
আরিফিন: দু’বছর! আমারও তখন হাতে কাজ ছিল না। কাজ করতে হবে...! (হা হা হেসে) রসিকতা করলাম। দু’বছর ধরে চিত্রনাট্য পাঠানো হত। মুম্বইয়ে ডেকেছিল, গিয়েছিলাম। তার পরেও কিছু বলে না। ওই দু’বছরে একই চরিত্রের জন্য ওঁরা আরও অনেকের অডিশন নিয়েছেন। একটা দৃশ্য অন্যকে দিয়ে করানোর পর সেই দৃশ্যই হয়তো আমাকেও পাঠানো হয়েছে। আমি টেপ করে পাঠিয়েছি। হয়তো ভাল লেগেছে। হয়তো ভাল লাগেনি। এ ভাবে ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’-এর মধ্যে দিয়েই সম্ভবত আমায় বাছা হয়েছে।
প্রশ্ন: আরেফিনের অহং-এ আঘাত লাগেনি?
আরিফিন: মাইকেল জ্যাকসন একটা সময় ‘কিং অফ পপ’ ছিলেন। তিনি কি আর সেই জায়গায় আছেন? একই কথা স্টিভ জোবসের ক্ষেত্রেও খাটে! তিনিও আর তাঁর জায়গায় নেই। এঁদের মতো তারকারা ‘অহং’ ত্যাগ করে বিদায় নিয়েছেন। আরিফিন শুভ সেই জায়গায় এমন কে, যে অডিশন দিতে পারবে না? শুরুতেই বলেছি, আরিফিন জীবনকে ও ভাবে দেখে না। কোনও গল্প বা চিত্রনাট্য জেনে যদি সেই কাজের অংশ হতে চাই, তার জন্য যদি আমায় অডিশন দিতে হয়, দেব। এটা তো একজন অভিনেতার কাজ। প্রিয়ঙ্কা চোপড়া জোনাসের মতো আন্তর্জাতিক তারকার যদি এই নিয়ে অস্বস্তি না থাকে, তা হলে আরিফিনের কেন থাকবে? বিশ্বে এ ভাবেই কাজ হয়। এখানে ‘অহং’ আসবে কেন? এ সব তো আমাদের বানানো!
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে উত্তাল হয়েছিল দুই বাংলা। আপনিও বাংলাদেশের। তাই আপনাকে বাছা হল?
আরিফিন: সবার আগে নিজেকে বিশ্ববাসী বলতে ভালবাসি। আমার মনে হয়, কোনও কাজের ক্ষেত্রেই আমি কোন দেশের বা ভৌগোলিক কারণ জড়িত থাকে না। উদাহরণ হিসাবে এই কাজটিকেই দেখুন। সিরিজ়ের অডিশন কখনও মুম্বইয়ে হয়েছে, কখনও কলকাতায়। আবার বাংলাদেশ থেকেও আমার অডিশন হয়েছে। যেহেতু কলকাতায় অনেক দিন ধরে কাজ করছি, সেই জায়গা থেকেও আমার অডিশনের কথা ভাবা হতেই পারে। আর সিরিজ়ের ‘জিমি রায়’ কিন্তু ভারতীয় চরিত্র। এখানে একাধিক ভাষায় অভিনয় করতে হয়েছে। এ বার স্পষ্ট, কেন কেবল ‘বাংলাদেশি’ বলেই এখানে সুযোগ পেয়েছি?
আরিফিন শুভ আর ‘জ্যাজ় সিটি’র পরিচালক সৌমিক সেন। নিজস্ব চিত্র।
প্রশ্ন: বাংলা ভাষা বারে বারে ‘রক্তাক্ত’। আগের মর্যাদা বা সম্মানও নাকি আর নেই! এই ভাষার যথার্য লালন নাকি এখনও পর্যন্ত শুধুই বাংলাদেশে হয়?
আরিফিন: দুই বাংলায় সমান ভাবে হয়। একটা উদাহরণ দিই। একজন স্প্যানিশভাষীর কাছে তাঁর মাতৃভাষার মতো প্রিয় অন্য আর কোনও ভাষা নয়। কারণ, তিনি নিজের মাকে ওই ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন। একই কথা বাঙালির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৪৭, ১৯৭১ সাল পেরিয়ে রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক কারণ পেরিয়েও বলব, বাংলাটাকে আলাদা করবেন কী করে? আপনাকে ‘কেমন আছেন’ প্রশ্ন করলে বলবেন, ‘ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?’ বাংলাকে দু’টুকরো করবেন কী করে? আমার মনে হয় না, কোনও দিকের বাঙালির কাছে বাংলা ভাষার আবেদন বিন্দুমাত্র কমেছে।
প্রশ্ন: আগামী দিনে দুই বাংলা মিলিয়ে আরিফিনের হাতে আর কী কাজ রয়েছে?
আরিফিন: ক্রমশ প্রকাশ্য। সময় এলে সব জানতে পারবেন। (একটু থেমে যোগ করলেন), কলকাতা যদি আবার ডাকে, কাজ করব। কলকাতা আমায় যত বার ডাকবে, তত বার আসব।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে ঋতুবদলের মতো রাজনৈতিক পালাবদলও ঘটেছে। দুই বাংলাকে ভাল রাখার জন্য নতুন সরকারের থেকে কী আশা করছেন?
আরিফিন: অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা ভারতে বসে বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজ দেখেন। আবার বাংলাদেশের মানুষেরাও এ পার বাংলার কাজ দেখতে ভালবাসেন। আমার মনে হয় না, মানুষে-মানুষে খুব একটা কিছু বদল ঘটেছে। আশা করছি, সময় সবার জীবনে শান্তি এনে দেবে। বাংলা ভাষাভাষীরা যাঁরা আছি, তাঁদের জীবনেও। সব ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যায়।