Motherhood Journey Of Chitrangada Satarupa

গর্ভ স্ফীত হতে একটু চিন্তিত হয়েছিলাম, আবার আগের চেহারায় ফিরে যেতে পারব তো? আমি যে অভিনেতা

“বাবার সঙ্গে মানসিক দিক থেকে কোনও যোগই নেই! তার জন্যই তো পদবি বদলে আমি শতরূপা চিত্রাঙ্গদা। বাবাকে মনেই পড়ে না।”

Advertisement
চিত্রা‌ঙ্গদা শতরূপা
শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৬
আসন্ন মাতৃত্ব নিয়ে অকপট চিত্রাঙ্গদা শতরূপা

আসন্ন মাতৃত্ব নিয়ে অকপট চিত্রাঙ্গদা শতরূপা ছবি: সংগৃহীত।

আমার মা পরিচালক-অভিনেত্রী শতরূপা সান্যাল খুব ভাল মা। লড়াকু মা আমাদের। দুই বোনকে সমান যত্ন নিয়ে বড় করেছেন। তখন থেকেই কি আমার মধ্যেও মা হওয়ার সুপ্ত বাসনা জন্ম নিয়েছিল? জানি না। তবে এটা জানি, আমি নিজের ইচ্ছায় মা হচ্ছি। কেউ আমার উপরে জোর করে মাতৃত্ব চাপিয়ে দেয়নি।

Advertisement

মাতৃত্বের পূর্বাভাস পাওয়াটাও আমার জীবনে ভীষণ অন্য রকম। অভিনেতা নওয়াজউদ্দীন সিদ্দীকীর সঙ্গে একটা ছবিতে অভিনয় করেছিলাম। নাম ‘ম্যায় অ্যাক্টর নেহি হুঁ’। ওই ছবির জন্য গত বছর আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কৃত হলাম। তখন আমি ওয়াশিংটন ডিসি-তে। পুরস্কার পাওয়ার আগে থেকেই শরীরে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। পুরস্কৃত হওয়ার পর সেই পরিবর্তন এতটাই বেড়ে গেল যে, ওখানেই পরীক্ষা করালাম। আগের রাতে অভিনয়ের জন্য পুরস্কৃত। পরের দিন জীবন আমায় পুরস্কৃত করল! ‘প্রেগন্যান্সি কিট’-এ বড় হরফে লেখা, ‘অন্তঃসত্ত্বা’!

আমি পুরস্কৃত হয়েছি। মা, শাশুড়ি, বোন, ননদ আনন্দে লাফাচ্ছেন। পরের দিন সকলে ফোন করেছেন। কেউ জানেন না, তাঁদের জন্য দুটো খবর অপেক্ষা করে রয়েছে। ভিডিয়ো কলে তাঁরা বলছেন, “তুই পুরস্কার পেলি। আমরা ভীষণ খুশি। দেখি তোর পুরস্কার?” আমিও নাটকীয় ভঙ্গিতে সকলের সামনে ‘প্রেগন্যান্সি কিট’ তুলে ধরেছি। বড় হরফের লেখা পড়ে ওঁরা বিস্ময়ে, আনন্দের আতিশয্যে হাবুডুবু খেয়েছেন! কোন পুরস্কার ছেড়ে কোনটা নেবেন? কোন খবরের জন্য প্রথম শুভেচ্ছা জানাবেন?

সাধভক্ষণের দিন চিত্রাঙ্গদা শতরূপা বোন ঋতাভরী চক্রবর্তীর সঙ্গে।

সাধভক্ষণের দিন চিত্রাঙ্গদা শতরূপা বোন ঋতাভরী চক্রবর্তীর সঙ্গে। ছবি: ইনস্টাগ্রাম।

আমি খুব খুশি। যেন আনন্দে মেঘমুলুকে। তার পরেই হঠাৎ শঙ্কার ছায়া। আমি বাবা উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর মতো দেখতে। ওঁর মতোই ভীষণ রোগা। কিন্তু একটা সময়ের পর শরীর ভারী হবেই। তখন কী হবে? এখনকার সব মেয়ে কমবেশি শরীর সচেতন। সেখানে আমি তো অভিনেত্রী! ‘দেহপট সনে নট সকলি হারায়’ আপ্তবাক্য শুনে বড় হয়েছি। ভয়টা যখন জাঁকিয়ে বসতে চলেছে, তখনই নিজেকে চোখ রাঙালাম। বলতে পারেন, নিজেই নিজের কাউন্সেলিং করলাম। নিজেকে বোঝালাম, নিজের ইচ্ছায় মা হয়েছি। তাই এই পরিবর্তন আমায় মেনে নিতে হবে। আর আমি তো তথাকথিত নায়িকা নই। শিফন শাড়ির আঁচল আর চুল উড়িয়ে পর্দায় দেখা দেব। আমি যে ধারার ছবিতে কাজ করি, সেখানে ফিতে মাপা ফিগারের প্রয়োজন পড়ে না। সেই ছবির পরিচালক এবং প্রযোজকেরাও ভিন্ন মানসিকতার।

মনে শান্তি ফিরতেই জীবনে যেন বাঁধভাঙা আনন্দ! দুই পরিবার ভেবেই পায় না, কী ভাবে আমার যত্ন করবে।

স্বামী সম্বিত চট্টোপাধ্যায় আমার ছেলেবেলার বন্ধু। বেচারি আমার জন্য আপাতত মুরগির মাংস খাওয়া ছেড়েছে। আমি খেতে পারছি না, তাই! একটু ক্লান্ত লাগলেই বসিয়ে পা টিপে দিচ্ছে। এ রকম আদরযত্নে থাকতে কার না ভাল লাগে? তবে আমি কিন্তু একেবারে বসে নেই। মাতৃত্বের একেবারে শুরুতে সৌরভ পালোধীর আগামী ছবি ‘অনেক দিন পরে’তে অভিনয় করেছি। শুটিংয়ে সাইকেল চালিয়েছি। এখন আমার স্ফীতগর্ভ। তাই নিয়ে বিজ্ঞাপনী ছবিতে অভিনয় করলাম। মুম্বই থেকে প্রযোজক, বিজ্ঞাপনী সংস্থা নিজেরা যোগাযোগ করে এসেছিলেন। ওঁদের বার বার বলেছি, আমার চেহারায় কিন্তু পরিবর্তন এসেছে। ওঁরা কানেই তোলেননি!

চিত্রাঙ্গদার পাশে বোন ঋতাভরী, মা শতরূপা।

চিত্রাঙ্গদার পাশে বোন ঋতাভরী, মা শতরূপা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম।

আজ আসন্ন মাতৃত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে একটা ব্যাপার অবাক করছে। পুরস্কার যখন পেলাম, তখন একসঙ্গে দুটো। সৌরভের ছবির নামের সঙ্গে আমার বাংলা ছবিতে ফেরার সময়কালের কী মিল! সত্যিই তো, আমিও টলিউডে অভিনয় করলাম অনেক দিন পরে। আবার মাতৃত্বের সময়কালে যেচে কাজ আসছে আমার কাছে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই সন্তান যেন আমায় ভরিয়ে দিচ্ছে! তবে এমনিতে ও কিন্তু খুবই দুষ্টু। রাত বাড়ে, আমার শরীরের মধ্যেই ওর দাপট বাড়ে। আমি ভালমন্দ খাই। ও যেন চনমনিয়ে ওঠে। হাত-পা ছুড়তে থাকে।

এ ভাবেই দিনগুলো কাটছে। দেখতে দেখতে সাত মাস। সেই আনন্দে মা আর শাশুড়ি মিলে রবিবার সাধভক্ষণের আয়োজন করেছিলেন। এর নেপথ্যেও একটা গল্প আছে। আগের দিনে মেয়েদের সন্তানের জন্ম দেওয়ার আগে ভালমন্দ খাওয়ানোর পিছনে যুক্তি ছিল। কারণ, চিকিৎসাশাস্ত্র তখন উন্নত ছিল না। বাড়িতে দাইমার হাতে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে অনেক মেয়ে মারা গিয়েছে। এখন অবশ্য সাধভক্ষণ আনন্দের। নতুন জীবনে প্রবেশের আগাম শুভেচ্ছা জানানোর নয়া রীতি। গত কাল ওঁরা গোলাপি সিল্কের শাড়িতে সু্ন্দর করে আমায় সাজিয়েছিলেন। পাতে সাজিয়ে দিয়েছিলেন পছন্দের সব খাবার। আমি কিন্তু তারিয় তারিয়ে খেয়েছি।

এ বার নিজেকে প্রস্তুত করার পালা। সব মেয়েই স্বপ্ন দেখে, সে যেন ‘সেরা মা’ হতে পারে। আমিও দেখছি। তবে সেরা নয়, ‘ভাল মা’ হওয়ার। যে মা পৃথিবীকে সুস্থ মনের, মান এবং হুঁশওয়ালা ‘মানুষ’-এর জন্ম দেবে। পিছনে তাই কাজে ফেরার তাড়া রাখিনি। আগে নিজেকে সময় দেব। পাশাপাশি সন্তানকেও। তার পর কাজে ফেরার ভাবনা। শুধুই তো অভিনয় নয়! আমি তো বিজ্ঞাপনী ছবিও বানাই। তাই অভিনয়ে ডাক পাওয়ার সংখ্যা যদি কমেও যায়, ‘কুছ পরোয়া নহি’। কিছু না কিছু কাজ করবই।

দুই পরিবারের সঙ্গে চিত্রাঙ্গদা শতরূপা।

দুই পরিবারের সঙ্গে চিত্রাঙ্গদা শতরূপা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম।

আর হ্যাঁ, যদি জিজ্ঞাসা করেন, এই বিশেষ সময়ে প্রয়াত পরিচালক বাবাকে কি মনে পড়ছে? আমার উত্তর, না। বাবার সঙ্গে কোনও কালেই আমার কোনও মানসিক বা আত্মিক টান ছিলই না। তার জন্যই তো পদবি বদলে আমি শতরূপা চিত্রাঙ্গদা। বাবাকে মনেই পড়ে না।

Advertisement
আরও পড়ুন